দশম শ্রেণীর ইতিহাসের তৃতীয় অধ্যায় ‘প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ: বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ’ (History Chapter 3) এর মধ্যে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের বিভিন্ন কৃষক ও উপজাতি বিদ্রোহ, যেমন—সাঁওতাল, কোল, মুন্ডা বা নীল বিদ্রোহের ইতিহাস এই অংশে খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আজকের পর্বে এই চ্যাপ্টার থেকে বাছাই করা ২/৪/৮ মার্কসের কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-উত্তর সহজ ভাষায় আলোচনা করা হলো।
প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ Class 10 প্রশ্ন উত্তর | দশম শ্রেণির ইতিহাস তৃতীয় অধ্যায় প্রশ্ন উত্তর
1) উপনিবেশিক অরণ্য আইনের উদ্দেশ্য কি ছিল ?
উত্তর: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে বিদ্রোহের পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সরকার ভারত শাসনের দায়িত্ব নেওয়ার পর চালু হওয়া বিভিন্ন আইন গুলির উদ্দেশ্য ছিল –
উদ্দেশ্য সমূহ :- ক) ভারতের রেলপথ নির্মাণের উদ্দেশ্যে রেলের স্লিপার তৈরির জন্য কাঠ সংগ্রহ করা। খ) বাণিজ্য ও যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের জন্য কাঠের জোগান সুনিশ্চিত করা। গ) মূল্যবান কাঠ রপ্তানি করে বনাঞ্চল থেকে রাজস্বের পরিমাণ বৃদ্ধি করা। ঘ) অরণ্যগুলির উপর উপনিবেশিক কর্তৃত্ব বৃদ্ধি করা।
2) বিদ্রোহ বলতে কী বোঝো ?
উত্তর: বিদ্রোহ :- প্রচলিত প্রথা, রাজনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক নির্দিষ্ট মতবাদ ও আদর্শে দ্বারা চালিত হয়ে মানুষ জোটবদ্ধভাবে সংগ্রাম করে কিন্তু শাসকের দ্বারা পরাজিত হয়, এই ব্যর্থ প্রচেষ্টা বিদ্রোহ নামে পরিচিত। বিদ্রোহের কয়েকটি উদাহরণ হল – চুয়াড় বিদ্রোহ, কোল বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, মুন্ডা বিদ্রোহ, সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, রংপুর বিদ্রোহ, পাবনা বিদ্রোহ প্রভৃতি।
3) অভ্যুত্থান বলতে কী বোঝো ?
উত্তর: অভ্যুত্থান :- অভ্যুত্থান বলতে বোঝায় সেই জাতীয় বিদ্রোহকে, যখন ওই বিদ্রোহের পিছনে ব্যাপক জনসমর্থন থাকে। স্বতঃস্ফূর্ত এই বিদ্রোহ আঞ্চলিক বা গোষ্ঠীগত হতে পারে, আবার সফল বা ব্যর্থ হতে পারে। যেমন – ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় নৌসেনার বিদ্রোহকে অভ্যুত্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। শাসকদের বিরুদ্ধে জনগণের বিদ্রোহ বা উত্থান হলে তাকে গণ অভ্যুত্থান বলে। আবার উপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে জনগণের বিদ্রোহকে জাতীয় অভ্যুত্থান বলে।
4) বিদ্রোহ ও বিপ্লবের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করো।
উত্তর: বিদ্রোহ ও বিপ্লবের মধ্যে পার্থক্য গুলি হল –
ক) বিদ্রোহ বলতে বোঝায় প্রচলিত ব্যবস্থার তীব্র বিরোধিতা করা। আর, বিপ্লব হলো প্রচলিত ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করা।
খ) বিদ্রোহের ফলে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক জগতে ব্যাপক কোনো পরিবর্তন ঘটে না। যেমন -সাঁওতাল বিদ্রোহ। আর, বিপ্লবের ফলে কোন দেশের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক এমনকি চিন্তার জগতে ব্যাপক ও সর্বাত্মক পরিবর্তন ঘটে। যেমন – ফরাসি বিপ্লব।
5) খুৎকাঠি প্রথা কী?
উত্তর: খুৎকাঠি প্রথা কথার অর্থ হল যৌথ কৃষিব্যবস্থা। মুন্ডারা বহুকাল ধরে জঙ্গল পরিষ্কার করে কৃষিকাজ করত এবং জমির যৌথ মালিকানা ভোগ করত। ব্রিটিশ আমলে তাদের যৌথ কৃষিব্যবস্থা বা খুৎকাঠি প্রথা-র অবসান ঘটিয়ে ব্যক্তিগত মালিকানা ব্যবস্থা চালু করায় মুন্ডারা ক্ষুদ্ধ হয়।
6) পাইক কাদের বলা হত? পাইকান জমি কি?
উত্তর: পাইক :- চুয়াড়রা মূলত মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও ধলভূম অঞ্চল নিয়ে গঠিত দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার জঙ্গলমহল বনাঞ্চলের অধিবাসী। কৃষিকাজ ও পশুশিকারের পাশাপাশি এরা স্থানীয় জমিদারদের অধীনে সৈনিক বা পাইকের কাজ করত বলে, এদের পাইক বলা হত।
পাইকার জমি :- জমিদারদের অধীনে যারা সৈনিকের কাজ বা পাইক বরকন্দাজের কাজ করত তাদেরকে বেতনের পরিবর্তে জমিদারেরা যে জমি নিঃশুল্কে ভোগদখলের জন্য দিতেন ওই জমিগুলোকে বলা হত পাইকান জমি।
7) কেনারাম ও বেচারাম কি?
উত্তর: দামিন-ই-কোহ অঞ্চলে বহিরাগত ব্যবসায়ীরা দুই ধরনের বাটখারা ব্যবহার করত।
ক) কেনারাম :- ব্যবসায়ীরা যখন সাঁওতালদের কাছ থেকে কৃষিপণ্য কিনত তখন বেশি ওজনের বাটখারা ব্যবহার করত, এই বেশি ওজনের বাটখারয় কেনারাম নামে পরিচিত।
খ) বেচারাম :- আবার ব্যবসায়ীরা যখন সাঁওতালদের লবণ, চিনি প্রভৃতি পণ্য বিক্রয় করতো তখন কম ওজনের বাটখারা ব্যবহার করতো, এই কম ওজনের বাটখারাকে বেচারাম বলা হতো
8) কামিয়াতি ও হারওয়াহি কী?
উত্তর: কামিয়াতি ও হারওয়াহি হল দুই প্রকারের চুক্তি বা বন্ড, যা ঋনদাতা মহাজন ও ঋণগ্রহীতা সাঁওতালদের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়।
কামিয়াতি :– কামিয়াতি হল ঋণ গ্রহীতা যতদিন না ঋণশোধ করতে পারবে ততদিন তাঁকে মহাজনের জমিতে বেগার খাটতে হবে
হারওয়াহি :– হারওয়াহি হল ঋন গ্রহীতাকে মহাজনের ভূমিতে বিনা পারিশ্রমিক লাঙল দিতে হবে। আর ৩৩ শতাংশ সুদ-সহ ঋনশোধ করতে হবে।
9) ভগনাডিহির মাঠ স্মরণীয় কেন?
উত্তর: দামিন-ই-হোক বলে পরিচিত রাজমহল পাহাড়সংলগ্ন এলাকার সাঁওতালরা ১৮৫৫ খ্রিঃ জমিদার, মহাজন ও ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে, যা সাঁওতাল বিদ্রোহ নামে পরিচিত।
ভগনাডিহি মাঠের ভূমিকা :- ১৮৫৫ খ্রিঃ ৩০ জুন ভগনাডিহির মাঠে ১০ হাজার সাঁওতাল সমবেত হয়ে সিধু ও কানু-র নেতৃত্বে স্বাধীন সাঁওতাল রাজ্য প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করে। প্রকৃতপক্ষে ভগনাডিহির মাঠ থেকেই সাঁওতালরা ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, তাই সাঁওতাল বিদ্রোহের ইতিহাসে ভগনাডিহির মাঠ বিশেষভাবে স্মরণীয়।
10) তিন কাঠিয়া প্রথা’ বলতে কী বোঝ?
উত্তর: নীলকর সাহেবরা বিহারের চম্পারণ জেলার কৃষকদের প্রতি বিঘা জমির ৩ কাঠায় নীলচাষ করতে বাধ্য করত। প্রতি বিঘায় ৩ কাঠা জমিতে বাধ্যতা মূলক এই চাষের প্রথা ‘তিন কাঠিয়া প্রথা’ নামে পরিচিত।
11) খ্রিস্টান মিশনারিদের জন্য মুন্ডাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবন কীভাবে বিপন্ন হয়েছিল ?
উত্তর: খ্রিস্টান মিশনারি ও বহিরাগতদের আগমনের জন্য মুন্ডাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবন নানাভাবে বিঘ্নিত হয়।
ক) ধর্মীয় :- মুন্ডাদের মধ্যে খ্রিস্ট ধর্মের প্রচার শুরু হলে তাদের নিজস্ব প্রাকৃতিক ধর্মের উপাসনা অনেকাংশে কমে যায়।
খ) সাংস্কৃতিক :- পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে মুন্ডাদের মধ্যে শিক্ষা-সংস্কৃতিতে বেশ কিছু ধ্যানধারণাগত পরিবর্তন ঘটে। এই ভাবে নতুন ধর্ম, নতুন সংস্কৃতি চালু হলে তাদের চিরাচরিত সংস্কৃতি বিপন্ন হয়।
12) সন্ন্যাসী ও ফকির কাদের বলা হত?
উত্তর: ভারতে মুঘল যুগের শেষের দিকে বিভিন্ন ভ্রাম্যমান সন্ন্যাসী ও ফকির সম্প্রদায়ের মানুষেরা বাংলা ও বিহারের নানা অংশে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন গিরি ও দশনামী সম্প্রদায়ভুক্ত সন্ন্যাসী এবং মাদারি সম্প্রদায়ভুক্ত ফকিরগন। এঁরা বাংলা ও বিহারে বসবাস করে কৃষির মাধ্যামে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকালে এই সকল সন্ন্যাসী ও ফকির সম্প্রদায়ের মানুষেরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন।
13) কবে, কাদের মধ্যে ‘চাইবাসার যুদ্ধ’ হয়েছিল? এই যুদ্ধে কারা পরাজিত হয়?
উত্তর: ১৮২০-২১ খ্রিস্টাব্দে কোল উপজাতি এবং পোড়াহাটের জমিদার ও সেনাপতি রোগসেস এর নেতৃত্বাধীন ইংরেজ বাহিনীর মধ্যে ‘চাইবাসার যুদ্ধ’ হয়েছিল। চাইবাসার যুদ্ধে কোলরা পরাজিত হয়।
14) সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ ব্যর্থ হল কেন?
উত্তর: ১৭৬৩-১৮০০ খ্রিঃ পর্যন্ত বাংলার সন্ন্যাসী ও ফকিররা ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন করেছিল, তা ইতিহাসে সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ নামে পরিচিত।
কারণ :- ক) ১৭৬৬ খ্রিঃ থেকে সন্ন্যাসী-ফকিরদের মধ্যে আত্মকলহের ফলে বিদ্রোহীরা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। খ) মজনু শাহ, ভবানী পাঠকদের মতো নেতারা পরাজিত ও নিহত হলে উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাবে এই বিদ্রোহ স্তিমিত হয়ে পড়ে। গ) উন্নত আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও সাংগঠনিক শক্তির অভাবে তারা ইংরেজ সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে মোকাবিলা করতে না পারলে এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়।
15) তিতুমির স্মরণীয় কেন ?
উত্তর: বাংলায় ওয়াহাবি আন্দোলনের নেতা ছিলেন মির নিশার আলি বা তিতুমির। তিনি রায়বেরিলির সৈয়দ আহমদ ব্রেলভির সংস্পর্শে এসে ওয়াহাবি আদর্শে অনুপ্রানিত হন এবং আন্দোলন শুরু করেন। তিনি বাংলায় জমিদার, মহাজন, নীলকর ও ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে কৃষক আন্দোলন সংগঠিত করেন। তিতুমির বাঁশের কেল্লা তৈরি করে ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে বীরের ন্যায় মৃত্যুবরণ করেন।
16) বারাসাত বিদ্রোহ কী?
উত্তর: বাংলার ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ছিলেন মির নিশার আলি বা তিতুমির। তিনি জমিদার মহাজন, নীলকর, ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং নিজেকে বারাসাত অঞ্চলের বাদশাহ বলে ঘোষনা করেন। ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে কাযুদ্ধে তিনি পরাজিত ও নিহত হন। ২৪ পরগণার বারাসাত অঞ্চলে তিতুমির এই আন্দোলন করেছিলেন বলে, একে বারাসাত বিদ্রোহও বলা হয়।
17) দুদু মিঞা স্মরণীয় কেন ?
উত্তর: ফরাজি আন্দোলনের প্রবর্তক হলেন হাজি শরিয়তউল্লাহ। ১৮৪০ খ্রিঃ হাজি শরিয়ৎ উল্লাহ-র মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মহম্মদ মহসিন বা দুদু মিঞা ফরাজি আন্দোলনের পরিচালক হন।
কারণ :-
ক) দুদু মিঞার তত্ত্ব ছিল বৈপ্লবিক । তিনি বলতেন, জমি আল্লাহের দান। সুতরাং, ভূমির উপর কর ধার্য করার অধিকার কারও নেই। খ) সুদক্ষ সংগঠক দুদু মিঞা বাংলায় তাঁর প্রভাবিত অঞ্চলে ফরাজ-ই ফিলাফৎ নামে এক প্রশাসন গড়ে তোলেন। গ) তিনি তাঁর প্রভাবিত অঞ্চলকে কয়েকটি হলকায় বিভক্ত করে প্রতি হলকায় একজন ও নীলকরদের অত্যাচার প্রতিহত করা। দুদু মিঞার নেতৃত্বে ফরাজিরা জমিদার ও নীলকরদের আক্রমন করে ত্রাসের সৃষ্টি করেছিল। এই সকল কারণে দুদুমি স্মরণীয়।
18) ফরাজি আন্দোলন ব্যর্থ হয় কেন?
উত্তর: হাজি শরিয়তউল্লাহ প্রবর্তিত ফরাজি আন্দোলন বিভিন্ন কারণে ব্যর্থ হয়েছিল।
ব্যর্থতার কারণ :-
ক) জন সমর্থনের অভাব :- ফরাজি আন্দোলন সংকীর্ণ ধর্মীয় চেতনার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল বলে রক্ষণশীল মুসলিম সমাজ আন্দোলনকারীদের সমর্থন করেনি।
খ) শক্তির অভাব :- ইংরেজ, জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো শক্তি আন্দোলনকারীদের ছিল না।
গ) নেতৃত্বের অভাব :- দুদু মিঞার পর উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাবে এই আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে।
19) ফরাজি আন্দোলন কি নিছক ধর্মীয় আন্দোলন ছিল?
উত্তর: উনিশ শতকে ভারতে মুসলমানদের মধ্যে ইসলামের পুনরুজ্জীবন নিয়ে যে আন্দোলন চলেছিল, তা পূর্ব বাংলায় ফরাজি আন্দোলন নামে পরিচিত হয়।
আন্দোলনের প্রকৃতি :- ফরাজি আন্দোলনের প্রকৃতি সর্ম্পকে ঐতিহাসিক দের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
ক) ধর্মীয় সংস্কার :- ইসলাম ধর্মের শুদ্ধতা রক্ষা, প্রয়োজনীয় সংস্কার-সাধন, সামাজিক কুসংস্কার দূরীকরণ এবং ইসলাম ধর্মের বিশ্ব জনীন আবেদন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই আন্দোলন শুরু হয়।
খ) কৃষক আন্দোলন :- ধর্মীয় রঙের ছোঁয়া লাগলেও এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল কৃষকদের ক্ষোভ ও অসন্তোষ।
গ) ব্রিটিশবিরোধিতা :- এই আন্দোলন ছিল ইংরেজ ও তার সমর্থক শ্রেণির বিরুদ্ধে পরিচালিত। ঐতিহাসিক বিনয়ভূষণ চৌধুরী বলেছেন, ফরাজি আন্দোলন মূলত প্রতিবাদী ধর্ম আন্দোলন হিসেবে দেখা দিলেও শেষ বিচারে কৃষক আন্দোলনের ব্যাপ্তি লাভ করেছিল।
20) ভিল কারা?
উত্তর: ভারতবর্ষের একটি প্রাচীনতম আদিবাসী সম্প্রদায় হল ভিল। গুজরাটে এবং মহারাষ্ট্রের খান্দেশ ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে এই আদিবাসী সম্প্রদায় বসবাস করত। এরা চাষবাস ও পশুপালনের মাধ্যমে স্বাধীন ও স্বনির্ভর জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল। ভিলরা বিভিন্ন কারনে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে, যা ভিল বিদ্রোহ নামে খ্যাত।
21) নীলকর কাদের বলা হত ?
উত্তর: ইংল্যান্ডে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে যে শিল্পবিপ্লব ঘটেছিল, তার প্রভাবে সেদেশে প্রচুর বস্তু উৎপাদিত হতে থাকে। ফলে বস্ত্র রং করার জন্য ব্যবহৃত রঞ্জক, অর্থাৎ নীলের চাহিদাও ক্রমশ বাড়তে থাকে। নীল হল একরকম কৃষিজ বাণিজ্য ফসল। বাংলার মাটি ও আবহাওয়া নীলচাষের উপযোগী ছিল। ১৮৩৩ খ্রিঃ সনদ আইনের সুবিধীয় ইংল্যান্ড ও অন্যান্য দেশ থেকে দলে দলে খামার মালিকেরা বাংলায় আসেন ও নীলচাষ শুরু করে উৎপাদন করতে থাকেন। তারাই নীলকর সাহেব নামে পরিচিত।
22) এলাকা চাষ বা নিছ আবাদি চাষ বলতে কী বোঝো?
উত্তর: ব্রিটিশ শাসনকালে বাংলার নীলকরদের দুরকম নীলচাষের জমি ছিল। যথা – এলাকা চাষ বা নিজ আবাদি চাষ এবং বেএলাকা চাষ বা রায়তি আবাদ।
এলাকা চাষ বা নিজ আবাদি চাষ :- ক) এলাকা চাষ বা নিজ আবাদি চাষ এইরকম নীলচাষের জমি ছিল নীলকরদের জমিদারির খাসভূমি। এই জমিতে নীলের চাষ করতে নীলকরদের নগদ টাকা খরচ করে দূর থেকে শ্রমিক ভাড়া করে আনতে হতো। (খ) নীল কমিশনের হিসাব অনুসারে নিজ এলাকা বা নিজ আবাদি ১০ হাজার বিঘা জমিতে নীলচাষের জন্য নীলকরদের খরচ পড়ত মোট ২.৫ লক্ষ টাকা।
23) বেএলাকা চাষ বলতে কী বোঝো?
উত্তর: এদেশে নীলচাষের ক্ষেত্রে নীলকর সাহেবদের হাতে এলাকা চাষ এবং বেএলাকা চাষ – এই দুই প্রকার জমি ছিল। ইউনিয়ন ব্যাংক ফেল করার পর নীলকরদের মূলধনে টান পড়ায় তারা ব্যয়সাপেক্ষ এলাকা চাষের বদলে বেএলাকা চাষ বা রায়তি আবাদ-এর দিকে উৎসাহিত হয়।
বেএলাকা চাষ :- ক) বেএলাকা চাষে রায়ত তার নিজ খরচাতেই নীলচাষ করত। বেএলাকা বা রায়তের জমিতে নীলচাষ করতে নীলকরদের সামান্য খরচ পড়ত। কারণ, জমি রায়তের হওয়ায় নীল করদের আর আলাদা করে জমি কিনতে হতো না, বরং তারা কৃষকের জমিতেই কৃষককে বিঘা প্রতি মাত্র ২ টাকা দাদন বা অগ্রিম দিয়ে নীলচাষ করাত।
খ) নীল কমিশনের হিসাব অনুযায়ী ১০ হাজার বিঘা রায়তি জমিতে নীলচাষের জন্য নীলকরের খরচ পড়ত মাত্র ২০ হাজার টাকা।
24) চুয়াড় কারা? কোন বিদ্রোহ চুয়াড় বিদ্রোহ নামে পরিচিত?
উত্তর: চুয়াড় :- ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ধলভূম ও বর্তমান ঘাটশিলা অঞ্চল নিয়ে জঙ্গলমহল গঠিত ছিল। এই জঙ্গলমহলের অধিকাংশ কৃষিজীবীদের ইংরেজ ও ইংরেজ সমর্থকরা চুয়াড় বলে অভিহিত করেন।
চুয়াড় বিদ্রোহ :- ক) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ওই জঙ্গলমহল অঞ্চলে রাজস্ব বৃদ্ধি করলে চুয়াড়রা বিদ্রোহ ঘোষণা করে, এটাই চুয়াড় বিদ্রোহ নামে পরিচিত। খ) ঘাটশিলার জমিদার জগন্নাথ সিং ধলের নেতৃত্বে ১৭৬৮ খ্রিস্টাব্দে এই বিদ্রোহ শুরু হয়। ৩২ বছর ধরে এই বিদ্রোহ চলেছিল।
25) বিরসা মুন্ডা স্মরণীয় কেন?
উত্তর: মুন্ডা বিদ্রোহের প্রধান নেতা বিরসা মুন্ডা মুন্ডাদের দীর্ঘদিনের অরণ্য সম্পদের অধিকারের ওপর সরকারি বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে ব্রিটিশরাজের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন মুন্ডারাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।তিনি বলেন বিদেশিদের বহিষ্কার না করলে কখনই স্বাধীনভাবে ধর্মচারণ করা সম্ভব নয়।অচিরেই তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন ও মুন্ডাদের চোখে ভগবান রূপে পুজিত হতে থাকেন। 1900 খ্রিস্টাব্দে এই মহান নেতা মৃত্যুবরণ করেন।
26) ‘জঙ্গল মহল’ বলতে কী বোঝো?
উত্তর: মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও ধলভূম (বর্তমানে ঘাটশিলা) অঞ্চল নিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার ঘন জঙ্গল আচ্ছন্ন বৃহৎ অঞ্চলকে বলা হয় ‘জঙ্গল মহল।
27) নীল বিদ্রোহে হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা কীরূপ ছিল?
উত্তর: বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস ও দিগম্বর বিশ্বাসের নেতৃত্বে শুরু হওয়া নীল বিদ্রোহের সময় কলকাতার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির অধিকাংশ লোক বিদ্রোহ সম্পর্কে উদাসীন থাকলেও কয়েকজন শিক্ষিত হৃদয়বান ব্যক্তি নীলচাষিদের সমর্থনে কলম ধরেন।
নীল বিদ্রোহে হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা :- হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকার সম্পাদক হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় নীল বিদ্রোহের প্রতি সহমর্মী অবস্থান নিয়েছিলেন। চাষিদের (নীল) দুর্দশা এবং নীলকরদের অত্যাচার সম্পর্কে সুনিশ্চিত প্রবন্ধ রচনা করে তিনি সরকারের চোখ খুলে দেন। ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকায় লেখা হয়েছিল–
ক) যে চাষি একবার নীলচাষ করেছে, বেঁচে থাকতে তার আর মুক্তি পাওয়ার উপায় নেই।
খ) নীলচাষে কোনো চাষিই ন্যায্য দাম পায় না, নীলচাষে লাভের চেয়ে ক্ষতি হয় বেশি ইত্যাদি।
মূলত হরিশচন্দ্রের উদ্যোগেই নীল বিদ্রোহের খবরাখবর বাংলা নিশ্চিত জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল।
মাধ্যমিক ইতিহাস তৃতীয় অধ্যায় 4 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর | ক্লাস ১০ প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ 4 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর
1. ঔপনিবেশিক অরণ্য আইন কী? ব্রিটিশ সরকার কি উদ্দেশ্যে এ আইন প্রণয়ন করেছিল? ১+৩
উত্তর : ভারত ছিল ব্রিটেনের উপনিবেশ। ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর ব্রিটিশ সরকার ভারতে অরণ্য সম্পদের উপর ভারতীয়দের অধিকার খর্ব করে সরাসরি নিজেদের অধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে, ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে ও ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে কতগুলি আইন প্রণয়ন করেন যা ঔপনিবেশিক অরন্য আইন নামে পরিচিত।
◾️ ঔপনিবেশিক অরণ্য আইন প্রবর্তনের উদ্দেশ্য :- ঔপনিবেশিক অরণ্য আইন প্রবর্তনের পিছনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা সক্রিয় ছিল—
১) অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য :– অরণ্য আইন প্রবর্তনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতে বিশাল বনভূমিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে তা ব্রিটিশ অর্থনীতির স্বার্থে ব্যবহার করা।
২) সামরিক উদ্দেশ্য :— অরণ্য আইন প্রবর্তনের পিছনে ব্রিটেনের সামরিক কারণ দায়ী ছিল। ইংল্যান্ডের রাজকীয় নৌ-বাহিনীর জন্য জাহাজ তৈরির প্রয়োজনীয় কাঠের অন্যতম সরবরাহ ক্ষেত্র ছিল এই ভারতীয় অরণ্য।
৩) কৃষিযোগ্য জমি বৃদ্ধি :— ইংরেজরা বনভূমি পরিষ্কার করে কৃষিযোগ্য জমির পরিমাণ বৃদ্ধি করতে চেয়েছিল যাতে রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে সরকারের আয় বৃদ্ধি পায়।
৪) রেলপথের প্রসার :— তৎকালীন গ্যারান্টি প্রথার মাধ্যমে যে সকল রেলওয়ে কোম্পানি ভারতে রেলপথ বিস্তারে কাজ করছিল তাদের রেল লাইনের স্লিপার ও অন্যান্য অংশ তৈরির জন্য প্রচুর কাঠের প্রয়োজন ছিল সেই কাঠের জোগানের জন্য অরন্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল।
উপসংহার :— সার্বিকভাবে বলা যায় ব্রিটিশ সরকার নিজেদের স্বার্থে উপনিবেশিক অরণ্য আইন প্রণয়ন করেছিল। ভারতীয় অরণ্য সম্পদের উপর সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করায় ছিল এর উদ্দেশ্য। তার কারণে অরণ্যচারী উপজাতি সম্প্রদায় অরণ্যের উপর তাদের চিরাচরিত অধিকার হারায়।
2. চুয়াড় বিদ্রোহের বিবরণ দাও। ০৪
উত্তর : ব্রিটিশ কোম্পানির শাসনকালে মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ধলভুম ও বর্তমান ঘাটশিলা নিয়ে জঙ্গলমহল গঠিত ছিল। এই অঞ্চলের অধিকাংশ কৃষিজীবীরা চুয়াড় নামে পরিচিত ছিল। ব্রিটিশ শাসকদের শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে ধলভূমের জমিদার জগন্নাথ সিংহ বিদ্রোহের সূচনা করেন।
বিদ্রোহের কারণ :—
১) উচ্চহারে রাজস্ব আদায় :– ব্রিটিশ কোম্পানির নতুন ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থায় মাধ্যমে চুয়াড়দের জমির উপর উচ্চহারে রাজস্ব ধার্য করে, ফলে তারা ক্ষিপ্ত হয়।
২) পাইকান জমি হাতছাড়া :– চুয়াররা জমিদারদের অধীনে বা সৈনিকের কাজ করত। বেতনের পরিবর্তে তারা নিষ্কর জমি ভাগ পেতো। এইসব জমিকে পাইকান জমি বলা হত কিন্তু ঔপনিবেশিক আইন চালু হলে চুয়াররা তাদের পাইকার জমি হারায় ফলে তাদের জীবিকা নির্বাহ দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
৩) অত্যাচার :– কোম্পানির রাজস্ব আদায়কারী কর্মচারীরা রাজস্ব আদায়ের নামে চুয়াড়দের উপর নির্মম অত্যাচার শুরু করলে চুয়াড়রা স্থানীয় জমিদারের নেতৃত্ব ঐক্যবদ্ধ হয়।
◾️বিদ্রোহের বিস্তার :– ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে চুয়াড় বিদ্রোহ ব্যাপক আকার ধারন করে জঙ্গল-মহলসহ মেদনীপুর জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিদ্রোহকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন রাইপুরের জমিদার দুর্জন সিংহ, মেদনীপুরের রানি শিরোমনি প্রমুখ। তারা সমবেতভাবে মেদিনীপুরের বিভিন্ন অঞ্চলে আক্রমন চালায়। বিদ্রোহীরা একে একে কাশিজোর, বাসুদেবপুর, তমলুক, জলেশ্বর, বলরামপুর, প্রভৃতি পরগনায় আক্রমন ও লুঠ চালাতে থাকে। বিদ্রোহীদের আক্রমণের হাত থেকে সরকারি দপ্তরও বাদ যায়নি।
◾️বিদ্রোহের অবসান :– বিদ্রোহীদের চাপে ইংরেজ পুলিশ ও কর্মচারিরা বিদ্রোহের মূল কেন্দ্র রায়পুর ছেড়ে পালিয়ে গেলেও শীঘ্রই সমস্ত ব্রিটিশ সেনাবাহিনী জমিদার ও চুয়াড়দের পরাজিত করে। রানি শিরোমণিকে হত্যা করে এবং দুর্জন সিংহকে গ্রেফতার করে এর ফলে বিদ্রোহ থেমে যায়।
◾️গুরুত্ব :– চুয়াড় বিদ্রোহ ব্যার্থ হলেও এই বিদ্রোহের পর চূয়াড়দের নিয়ন্ত্রনে আনার উদ্দেশ্যে বিট্রিশ সরকার চুয়াড় অধুষ্যিত এলাকায় শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটায়। এছাড়া তাদের রাজস্বের পরিমান কমায়। বিষ্ণুপুর শহরটিকে কেন্দ্র করে দুর্গম বনাঞ্চল নিয়ে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ‘জঙ্গলমহল’ নামে একটি পৃথক জেলা গড়ে ওঠে।
3. ঊনিশ শতকে বাংলার সমাজ সংস্কার আন্দোলন সম্পর্কে বর্ণনা দাও। ০৪
উত্তর : উনিশ শতকে পাশ্চাত্য চিন্তাধারায় সংস্পর্শে এসে বাংলার প্রগতিশীল উদারপন্থী গণ কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন, যা সমাজ সংস্কার আন্দোলন নামে পরিচিত।
উনবিংশ শতাব্দীর সমাজ সংস্কার আন্দোলন সমূহ:
১.) রাজা রামমোহন ও সতীদাহ প্রথা বিরোধী আন্দোলন :— ভারতের সমাজ সংস্কার আন্দোলনের পথিকৃত ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। মনুসংহিতা ও অন্যান্য শাস্ত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি প্রমাণ করেন যে শাস্ত্রে বিধবাদের পুড়িয়ে মারার কোন নিয়ম নেই। রামমোহন রায় সংবাদ কৌমুদি পত্রিকা প্রকাশ করে সতীদাহ প্রথার তীব্র বিরোধিতা করেন। বড়লার লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে ১৭ নম্বর রেগুলেশন আইন জারি করে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেন। রামমোহন নারীদের সম্পত্তি উত্তরাধিকারের স্বীকৃতি সমর্থন এবং পুরুষদের বহুবিবাহের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন। তিনি জাতিভেদ প্রথার বিরোধী ছিলেন ও অসবর্ণ বিবাহের সমর্থনে ছিলেন।
২.) ব্রাহ্ম সমাজের সমাজ সংস্কার আন্দোলন :– রামমোহন প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মসমাজ পরবর্তীকালে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে বিভিন্ন সমাজ সংস্কার আন্দোলন গড়ে তোলে। কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে ব্রাহ্মসমাজের আন্দোলনের ফলে ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে তিন আইন দ্বারা বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ নিষিদ্ধ হয় এবং অসবর্ণ বিবাহ সিদ্ধ হয়।
৩.) বিদ্যাসাগর ও বিধবা বিবাহ আন্দোলন :– বিদ্যাসাগর নারীর অকাল বৈধব্য জীবনের দুঃখ ও দুর্দশা দেখে বিচলিত হয়েছিলেন। তিনি সমাজের বিধবা বিবাহ প্রচলনের জন্য চেষ্টা করেন। এর জন্য তিনি অনেক পুস্তক রচনা করেন এবং গণস্বাক্ষর গ্রহণ করে সরকারের কাছে আবেদনপত্র পেশ করেন। শেষ পর্যন্ত ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দের ২৬ শে জুলাই আইন জারি করে বিধবা বিবাহ সম্মত বলে ঘোষণা করেন।
৪.) ডিরোজিও ও ইয়ং বেঙ্গলের সমাজ সংস্কার আন্দোলন :– ডিরোজিও ছিলেন কলকাতা হিন্দু কলেজের শিক্ষক। তার অনুগামীরা ইয়ং বেঙ্গল বা নব্য বঙ্গ গোষ্ঠী নামে পরিচিত। ইয়ং বেঙ্গল সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল। জাতিভেদ প্রথা অস্পৃশ্যতা, সতীদাহ প্রথা ও প্রচলিত হিন্দু ধর্ম তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিল। তারা মাতৃভূমি ভারতবর্ষকে ভালবাসতেন। কিন্তু ভারতীয় সমাজ সংস্কার গুলোকে ঘৃণা করতো। তবে তাদের উগ্র কালাপাহাড়ি মনোভাবের জন্য সমাজ থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।
৫.) অন্যান্য কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলন :–
ক) গঙ্গায় সন্তান বিসর্জনের বিরুদ্ধে আন্দোলন :– বঙ্গোপসাগরে সন্তান বিসর্জন দেওয়ার মতো নিষ্টুর প্রথা ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দ ও ১৮০২ খ্রিস্টাব্দে দুটি রেগুলেশন জারি করে সরকার এই নিষ্ঠুর অবসান ঘটায়
খ) নরবলি প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন :– ভারতে অনেক উপজাতি সম্প্রদায়ের মধ্যে ও ধর্মীয় উদ্দেশ্যে কোনো কোনো রাজ পরিবারে নরবলি প্রথা প্রচলিত ছিল। লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে এই প্রথার নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেন।
◾️উপসংহার :— পরিশেষে বলা যায় প্রগতিশীল ভারতীয়দের সমাজ সংস্কার আন্দোলন একটি মহৎত্তর প্রচেষ্টা। ইংরেজ সরকার এই সংস্কার আন্দোলনের পক্ষে কিছু আইন প্রণয়ন করেছিল। তবে কুসংস্কারের চিরাচরিত কাঠামো একেবারে ভেঙে ফেলতে পারেনি।
4. নীল বিদ্রোহে বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের বা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের ভূমিকা লেখো। ০৪
উত্তর : ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় নীলচাষিদের নেতৃত্বে যে বিদ্রোহ সংঘটিত হয় তাতে মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখক, সম্পাদক, আইনজীবী প্রভৃতি শ্রেণি বিদ্রোহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১) সংবাদপত্রের ভূমিকা :— বিভিন্ন পত্রপত্রিকাতে নীলকর ও তাদের নায়েব-গোমস্তাদের নির্মম অত্যাচারের কথা, অসহায় কৃষকদের দুরবস্থার কথা সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়। ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’, ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকা, ‘সংবাদ প্রভাকর’, ‘সমাচার চন্দ্রিকা’, ‘সোমপ্রকাশ’, ‘সমাচার দর্পণ’ প্রভৃতি পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
২) আইনজীবীদের ভূমিকা :— নীল বিদ্রোহে বাঙালি আইনজীবীদের ভূমিকা বিশেষ প্রশংসনীয়। এইসময় নীলকররা চাষিদের নামে অজস্র মিথ্যা মামলা দায়ের করে। এগুলি চালাবার মতো আর্থিক ক্ষমতা দীনদুঃখী কৃষকদের ছিল না। আইনজীবীরাই স্বতঃপ্রণোদিতভাবে কৃষকদের হয়ে মামলা লড়েন। তাঁরাই অত্যাচারী নীলকরদের বিরুদ্ধে কৃষকদের উৎসাহিত করেন। প্রখ্যাত আইনজীবী প্রসন্নকুমার ঠাকুর, শম্ভুনাথ পণ্ডিত, ম্যাজিস্ট্রেট হেমচন্দ্র কর প্রমুখের ভূমিকা প্রশংসনীয় ছিল যথেষ্ট প্রশংসনীয়।
৩) সাহিত্যিকদের ভূমিকা :— বিভিন্ন সাহিত্যিক তাঁদের সাহিত্যকর্মের দ্বারা নীলকরদের বিরুদ্ধে চাষিদের উৎসাহিত করেন। নাটক, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ইত্যদির মাধ্যমে শিক্ষিত শ্রেণির দৃষ্টি আকর্ষণ ও সরকারের স্বরূপ তুলে ধরার প্রয়াস চলে। জনমত সৃষ্টিতে দীনবন্ধু মিত্র, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অক্ষয়কুমার দত্ত প্রমুখের ভূমিকা বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
৪) নীল দর্পণ নাটকের ভূমিকা :— এক্ষত্রে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ (১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে) নাটক। গ্রন্থটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং প্রকাশিত হয় ব্রিটিশ ধর্মযাজক রেভারেন্ড জেমস লঙ-এর নামে। এর জন্য লঙ সাহেবের একমাস কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা হয়। কালীপ্রসন্ন সিংহ ঐ টাকা দিয়ে মহানুভবতার পরিচয় দান করেন।
সীমাবদ্ধতা :— বুদ্ধিজীবীদের একাংশ নীল বিদ্রোহ সমর্থন করেনি। কারণ তাঁদের মনে হয়েছিল নীল চাষের মাধ্যমে গ্রামগুলি সমৃদ্ধ হবে, চাষিদের আর্থিক অবস্থা ভালো হবে। সেই কারণে রামমোহন রায়, দ্বারকানাথ ঠাকুর প্রমুখ নীলকরদের অত্যাচারের অবসান চেয়েছেন, কিন্তু তা সরকার বিরোধী আন্দোলন হয়ে উঠুক এটা চাননি।
মাধ্যমিক ইতিহাস তৃতীয় অধ্যায় বড়ো প্রশ্ন উত্তর | প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ: বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ ৮ মার্কস প্রশ্ন উত্তর
1. টীকা লেখো :- কোল বিদ্রোহ। ০৮
উত্তর : কোলরা ছিল বর্তমান বিহারের ছোটনাগপুর, সিংভূম, মানভূম প্রভৃতি অঞ্চলে বসবাসকারী উপজাতি। এদের উপর ব্রিটিশ সরকার ও বহিরাগত জমিদারের তীব্র শোষণের ফলে তারা যে বিদ্রোহ করেছিল, তা কোল বিদ্রোহ নামে পরিচিত।
কোল বিদ্রোহের কারণ:
১) উচ্চ হারে রাজস্ব আদায় :- আগে কোলরা রাজস্ব দিত না, কিন্তু ছোটনাগপুর অঞ্চলে শাসনভার ইংরেজ কোম্পানির হাতে যাওয়ার পর এখানে ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা চালু হয়। এবং মহাজনেরা উচ্চ হারে রাজস্ব আদায় শুরু করেছিল।
২) জমি থেকে উৎখাত :- ইজারাদাররা কোলদের সর্বস্ত্র কেড়ে নিতে থাকে। এমনকি জমি থেকেও তাদের উৎখাত করতে শুরু করে।
৩) বেকার খাটা :- রাস্তা তৈরি ও অমান্য কাজে কোলদের বেগার শ্রম দিতে হতো যার ফলে তাদের মনের ক্ষোভের সঞ্চার ঘটে।
৪) নির্যাতন :– কোলদের উপর নানাভাবে নির্মম নির্যাতন চালানো হতো। এক্ষেত্রে অনেক সময়ে কোল নারীদের সম্মান নষ্ট করা হতো। এছাড়াও কোলদের আফিম চাষের জন্য বাধ্য করা হতো।
৫) নিজস্ব আইনে আঘাত :- নিজস্ব আইন-কানুন, বিচার পদ্ধতি ধ্বংস করে তাদের উপর জোর করে ব্রিটিশদের আইন-কানুন ও বিচার পদ্ধতি চাপিয়ে দেওয়া হতো তাই কোলরা বিদ্রোহের পথে পা বাড়ায়।
▪️ বিদ্রোহের সূচনা :- কোলদের উপর শোষণ ও অত্যাচারের প্রতিবাদে বুদ্ধু ভগত, জোয়া ভগত, সিংরাই, ঝিন্দরাই মানকি, সুই মুন্ডা প্রমুখেরা কোলদের সমবেত করেন। ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে রাঁচি জেলার মুন্ডা এবং ওয়াও সম্প্রদায়ের কৃষকরা সর্বপ্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করে তা আস্তে আস্তে সিংভূম, হাজারীবাগ, পালামৌ ও মানভূমের পশ্চিম অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
▪️ বিদ্রোহ দমন :- বিদ্রোহ দমনের জন্য ইংরেজরা ক্যাপ্টেন উইলকিনসনের নেতৃত্বে কলকাতা, পাটনা, দানাপুর, সম্বলপুর থেকে সৈন্য এনেছিল। আধুনিক অস্ত্র ও গোলন্দাজ বাহিনীর সাহায্যে হাজার হাজার কোল নর-নারী ও শিশুদের নির্মমভাবে হত্যা করে ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার কোল বিদ্রোহ দমন করেছিল।
বিদ্রোহের গুরুত্ব বা ফলাফল :- ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার বিদ্রোহ দমন করলেও এই বিদ্রোহের গুরুত্ব বা ফলাফল ছিল–
ক) বিদ্রোহের ফলে কোল অধ্যুষিত অঞ্চলে সরকারি নীতির কিছু পরিবর্তন ঘটে।
খ) কোলদের জন্য দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এজেন্সি নামে একটি পৃথক ভূখণ্ড নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়।
গ) জমিদারদের দখল করা জমি কোলদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
2. সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণ ও গুরুত্ব লেখো। ৪+৪
উত্তর : ভারতের ছোটনাগপুর, পালামৌ, মানভূম, বাঁকুড়া ও মেদিনীপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসী উপজাতি হল সাঁওতাল। এরা কঠোর পরিশ্রমী শান্তি প্রিয় কৃষিজীবী সম্প্রদায়। সাঁওতালরা ১৮৫৫–৫৬ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ অত্যাচারী ব্রিটিশ সরকার ও তাদের সহযোগী মহাজনদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
◾️সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণ :— সাঁওতালরা বিভিন্ন কারণে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। যেমন–
১) সাঁওতালদের জমি গ্রাস :— সাঁওতালরা কঠোর পরিশ্রম করে দামিন-ই-কোহ পাথুরে জঙ্গলাকীর্ণ জমিকে চাষযোগ্য জমিতে পরিণত করে তোলে। তাদের ওই জমিগুলি মহাজনরা নানা অজুহাতে দখল করে নিলে সাঁওতালদের মনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়।
২) উচ্চ হারে রাজস্ব আরোপ :— আদিবাসী সাঁওতালরা পতিত ও পাথুরে জমিকে চাষযোগ্য করে তুললে কোম্পানির জমিদারগণ ওই জমির উপর উচ্চ হাড়ে রাজস্ব আরোপ করলে সাঁওতালরা ক্ষুব্ধ হয়।
৩) সাঁওতাল ঐতিহ্যে আঘাত :— সাঁওতালরা তাদের নিজস্ব রাজনীতি ও ঐতিহ্য দ্বারা চালিত হলেও বাংলার ছোট লাট ফ্রেডারিক হ্যালিডের নির্দেশে সেগুলি বাতিল হয়।
৪) মহাজনদের শোষণ :— নতুন ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থায় নগদ অর্থে খাজানা দিতে হতো। সাঁওতালরা নগদ অর্থের জন্য মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিতো ও ফসল বিক্রি করতো মহাজনরা, ঋণ দেওয়ার সুযোগে ৫০–৫০০ % হারে সুদ আদায় করত এবং বেগার শ্রম দিতে বাধ্য করতো।
৫) ব্যবসায় দুর্নীতি :— অসাধু ব্যবসায়ীরা সাঁওতালদের সরলতা ও অশিক্ষার সুযোগে সাঁওতালদের কাছ থেকে কিছু কেনার সময় ‘কেনারাম’ নামক বেশি ওজনের বাটখারা এবং সাঁওতালদের বিক্রি করার সময় কম ওজনের ‘বেচারাম’ বাটখারা ব্যবহার করত।
৬) ধর্মান্তরিত করণের প্রচেষ্টা :— সাঁওতালরা ছিল প্রকৃতির পূজারী খ্রিস্টান মিশনারীরা সুকৌশলে সাঁওতালদের ধর্মান্তরিত করতে গেলে সাঁওতালরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।
গুরুত্ব :— সাঁওতাল বিদ্রোহ দমনে বিশাল ব্রিটিশ বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে। সিধু, কানুসহ বেশ কয়েকজন নেতাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। ১০০০০ সাঁওতালকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ওই বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও এই বিদ্রোহের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল। সেগুলি হল—
১) সাঁওতাল পরগনা গঠন :— উত্তরে গঙ্গার কাছাকাছি তেলিয়া গড়াই পরগনার সঙ্গে বীরভূম ও ভাগলপুর থেকে ৯০০০ বর্গ কিমি জায়গা জুড়ে সাঁওতাল পরগনা গঠন করেছিল ব্রিটিশ সরকার।
২) পৃথক উপজাতি হিসেবে স্বীকৃতি :— সাঁওতালদের পৃথক উপজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সাঁওতাল পরগনার শান্তিরক্ষার জন্য পুলিশের পরিবর্তে মাঝি ও সাঁওতাল গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা প্রদান করা হয়
৩) সুদের হার নির্দিষ্ট করা :— সাঁওতালদের অধিসৃত অঞ্চলে বাঙালি মহাজনদের প্রবেশ নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করা হয়েছিল এবং সুদের হার নির্দিষ্ট করা হয়েছিল।
উপসংহার :— সাঁওতাল বিদ্রোহ আপাত দৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়েছিল ঠিকই কিন্তু এই বিদ্রোহ ব্রিটিশ সরকারকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছিল। সাঁওতাল বিদ্রোহ গুরুত্ব প্রসঙ্গে ডা. রমেশ চন্দ্র মজুমদার বলেছেন যদি ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহকে স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে মনে হয় তাহলে সাঁওতাল বিদ্রোহকে স্বাধীনতা সংগ্রামের মর্যাদা দেওয়া উচিত।
3. নীল বিদ্রোহের কারণ ও গুরুত্ব লেখো। ০৮
উত্তর : নীলচাষ ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন চাষ। বাংলার নীল চাষিরা ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দ নীলচাষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করেন। এই বিদ্রোহ নীলবিদ্রোহ নামে পরিচিত। নীল বিদ্রোহের প্রথম সূচনা হয় তৎকালীন নদীয়া জেলার চৌগাছা গ্রামে। ক্রমে এই বিদ্রোহ বাঁকুড়া, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ, দিনাজপুর, পাবনা, ফরিদপুর, খুলনা, প্রভৃতি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। নীল বিদ্রোহের প্রধান নেতা হল বিষ্ণূচরন বিশ্বাস ও দিগম্বর বিশ্বাস। কাদের মোল্লা প্রমুখ।
◾️নীল বিদ্রোহের কারণ :— নীল বিদ্রোহের পিছনে কারনগুলি হল–
১) নীলকরদের অত্যাচার :– নীলকররা নীলচাষিদের নানাভাবে অত্যাচার করে নীলচাষ করতে বাধ্য করত, অনৈচ্ছিক চাষিদের প্রহার করা, আটকে রাখা, স্ত্রী-কন্যার সম্মানহানি করা, চাষের সরঞ্জাম লুঠ করা। ঘরে আগুন লাগিয়ে দেওয়া প্রভৃতি নানাভাবে চাষিদের অত্যাচার করত।
২) দাদন প্রথা :– নীলকররা নীলচাষের জন্য চাষিকে বিঘা পিছু মাত্র ২ টাকা অগ্রিম দাদন দিত। কোনো চাষি একবার দাদন নিলে তা আর কখনোই নীলকরদের খাতায় পরিষদ হত না।
৩) প্রতারনা ও কারচুপি :– নীলকররা নীলচাষিদের বিভিন্নভাবে প্রতারনা রত। নীল কেনার সময় নীলের ওজন কম দেখাতো।
৪) জমির মাপে কারচুপি :– নীলকরদের কাছে দাদন নিয়ে যে জমিতে চাষিকে নীলচাষ করতে হতো, তা মাপের সময় নীলকররা ব্যাপক কারচুপি করত। তারা গড়ে প্রতি ২.৫ বিঘা জমিকে ১বিঘা বলে গণ্য করত। ফলে চাষিকে নীলচাষে জমি ব্যবহার করতে হত।
৫) অবিচার :– অত্যাচারিত নীলচাষিরা আদালতে গিয়েও সুবির পেত না। আইন ছিল নীলকরদের স্বার্থরক্ষার জন্য চাষিদের জন্য নয়। তাছাড়া পুলিশ প্রশাসন সবই ছিল নীলকরদের পক্ষে।
উপরিউক্ত কারণগুলির জন্যই নীলচাষিদের মনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। ফলস্বরূপ বিষ্ণুচরন বিশ্বাস ও দিগম্বর বিশ্বাস -এর নেতৃত্বে নীলকরদের বিরূদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষনা করে ।
◾️নীল বিদ্রোহের ফলাফল ও গুরুত্ব :– উনিশ শতকে ইউরোপ থেকে আগত নীলকর সাহেবদের শোষন ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাংলার নীলচাষিরা ১৮৫৯-৬০ খ্রিস্টাব্দে শক্তিশালী বিদ্রোহ গড়ে তোলে। এই বিদ্রোহের ফলাফলগুলি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
১) জাতীয় কমিশন :– বিদ্রোহের পর সরকার ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে নীলকমিশন গঠন করেন। কমিশনের পক্ষ থেকে নীলকরদের চরম অত্যাচার ও নির্যাতনের কাহিনী প্রকাশিত হয়।
২) হিন্দু ও মুসলমান ঐক্য :– নীলকরদের অত্যাচার বাংলায় হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ঐক্যবোধকে দৃঢ় করে। উভয় সম্প্রদায়ের কৃষকরা যৌথ ভাবে শাসক সম্প্রদায়ে বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ।
৩) শিক্ষিত ব্যক্তি বর্গের সমর্থন :– নীল বিদ্রোহকালে হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র, শিশির কুমার ঘোষ সহ বহু শিক্ষিত ব্যাক্তিত্ব তাদের লেখনির মাধম্যে জনমত গঠনে এগিয়ে এসেছে। এর ফলে কৃষকদের সঙ্গে শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত শ্রেনির যোগসূত্র গড়ে ওঠে।
৪) স্বাধীনতা আন্দোলনের পথ প্রদর্শক :– নীল বিদ্রোহ,পরবর্তী কালে ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলনগুলি পথপ্রদর্শক ছিল। এই আন্দোলনই ভারতবাসীকে স্বাধীনতার প্রেরণা জাগিয়ে ছিল।
◾️উপসংহার :– উপরিক্ত আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায় নীল বিদ্রোহ ছিল ভারতের কৃষক আন্দোলনের এক গৌরব উজ্জ্বল অধ্যায়। এই বিদ্রোহে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের কৃষকরা যেভাবে আন্দোলন গড়ে তোলে তা পরবর্তিকালের কৃষক আন্দোলনগুলিকে প্রেরণা জোগায়। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়কে ব্রিটিশ মোহ থেকে মুক্ত করে এই বিদ্রোহ।
4. ফরাজি আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য লেখো? এই আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ লেখো? ৪+৪
উত্তর : আরবি ভাষায় ‘ফরাজি’ শব্দটির অর্থ হল ‘ইসলাম নির্দিষ্ট বাধ্যতামূলক কর্তব্য’। ১৯ শতকে ভারতে মুসলমানদের মধ্যে কুসংস্কার, অনাচার দূর করে তাদেরকে পবিত্র ইসলাম ধর্মের অনুগামী করে তুলার জন্য হাজি শরিয়ত উল্লাহ এক পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলন গড়ে তোলেন এটি ফরাজি আন্দোলন নামে পরিচত। এই আন্দোলন ১৮১৮-১৯০৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চলেছিল।
◾️আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য :—
১) ইসলামের শুদ্ধিকরণ :– এই আন্দোলন ছিল ইসলামের শুদ্ধিকরন আন্দোলন। শরিয়ত উল্লাহ তার অনুগামীদের ইসলামের পবিত্র আদর্শ মেনে চলার কথা বলেন।
২) কৃষক আন্দোলন :– প্রথমে ধর্মীয় আন্দোলন রূপে শুরু হলেও পরে তা ইংরেজ, জমিদার, মহাজন, বিরোধী কৃষক আন্দোলনে পরিণত হয়।
৩) দরিদ্র ও মুসলমানদের আধিক্য :– মূলত দরিদ্র মুসলিম কৃষকদের মধ্যে ফরাজি আন্দোলনের প্রভাব পরে। এই কৃষকরাই জমিদার ও নীলকর দ্বারা বিশেষ ভাবে শোষিত হত।
৪) দক্ষ করার প্রশাসনিক ব্যবস্থা গঠন :– অত্যাচারী শাসকদের প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে ফরাজিরা দক্ষ গুপ্তচর ও লাঠিয়াল বাহিনী গড়ে তোলে। এমনকি তাদের নিজস্ব আদলতও ছিল।
◾️ফরাজি আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ :– ফরাজি আন্দোলনে দরিদ্র মুসলিম কৃষক শ্রেণি যোগ দিয়েছিল। একটি প্রতিবাদী ধর্ম আন্দোলন রুপে ফরাজি আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটলেও নানা কারণে ব্যর্থতাই পর্যবসিত হয়।
১) সংকীর্ণ’ কর্মবোধ :– সংকীর্ণ ধর্মবোধ ও চেতনার ওপর ভিত্তি করে এই আন্দোলন গড়ে ওঠেছিল। তাই উদারপ্রন্থী মুসলমান সমাজ এই আন্দোলন থেকে দূরে সরে থাকে। ফলে সংহতির অভাবে এই আন্দোলন ব্যর্থ হয়।
২) সুযোগ্য নেতৃত্বের অভাব :– শরিয়ত উল্লাহ ও তার পুত্র দুদুমিঞার মৃত্যুর পর ফরাজিদের মধ্যে আর কোনো সুযোগ্য নেতার আবির্ভাব ঘটেনি। দুদুমিঞার দীর্ঘ কারাবাসে আন্দোলন নেতৃত্বহীন হয়ে পরে।
৩) সুস্পষ্ট লক্ষ্যের অভাব :– কোনো সুপষ্ট লক্ষ্য না থাকায় এই আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছিল। প্রথম দিকে ইসলাম ধর্মের সংস্কার, পরবর্তী সময়ে নীলচাষ ও জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ শেষে আবার ধর্মীয় উদ্দেশ্যে এই আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল।
৪) সীমাবদ্ধতা :– এই আন্দোলন একটি ভৌগলিক অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এই আন্দোলন ব্যাপক হারে বিস্তার লাভ করেনি।
৫) চরম দমন নীতি :– ফরাজিরদের আন্দোলন ইংরেজ সরকারদের যথেষ্ট উদবিগ্ন করে তুলেছিল। তাই তারা জমিদার ও নীলকরদের সহাতায় এই আন্দোলন দমন করেছিল।
◾️উপসংহার :— নানা কারণে ফরাজি আন্দোলন ব্যর্থ হলেও এই আন্দোলনের গুরত্ব ছিল অনস্বীকার্য। এর ফলে মুসলাম সমাজ থেকে বহু কুসংস্কার দূর হয়। ফরাজিদের প্রচেষ্টা পরবর্তী প্রজন্মকে বিদ্রোহের প্রেরণা কথা জাগিয়ে ছিল।
আগের অন্যান্য অধ্যায়ের প্রশ্ন উত্তর:
প্রথম অধ্যায় ‘ইতিহাসের ধারণা’ প্রশ্ন উত্তর (MCQ & SAQ)
ইতিহাসের ধারণা (প্রথম অধ্যায়) ২/৪ নম্বর প্রশ্ন উত্তর
MCQ ও সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ইতিহাস ‘সংস্কার: বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা’
সংস্কার: বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা বড়ো প্রশ্ন উত্তর (২/৪/৮ মার্কস)
| Details | Link |
|---|---|
| মাধ্যমিক প্রস্তুতি WhatsApp গ্রুপ (যারা ইতিমধ্যে জয়েন আছো আর জয়েন হওয়ার দরকার নেই..) | |
| Class 10 মাধ্যমিক ইতিহাস অন্যান্য অধ্যায় নোটস → | Click Here » |
দশম শ্রেণির ইতিহাস তৃতীয় অধ্যায় 4 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর | প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ প্রশ্ন উত্তর 8 নম্বর | দশম শ্রেণির ইতিহাস তৃতীয় অধ্যায় 2 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর | প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ: বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ বড়ো প্রশ্ন উত্তর
আজকের পোস্টে প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ (তৃতীয় অধ্যায়) থেকে ২/৪/৮ নম্বরের প্রশ্ন উত্তর আলোচনা করা হল, যেগুলি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। প্রয়োজনে প্রশ্ন গুলি খাতায় টুকে নিবে।
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম Study গ্রুপে যুক্ত হোন -


