পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যালয় শিক্ষাব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসতে চলেছে। রাজ্যভিত্তিক বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় যোগ্য এবং বিশ্বায়নের যুগের উপযোগী করে গড়ে তুলতে এক দীর্ঘমেয়াদী সুনির্দিষ্ট ‘রোডম্যাপ’ তৈরির কাজে হাত দিল নবগঠিত রাজ্য সিলেবাস কমিটি। ২০২৮ সালের শিক্ষাবর্ষ থেকে রাজ্যজুড়ে প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু করে দ্বাদশ শ্রেণি সম্পূর্ণ পাঠ্যক্রম ও শিক্ষাকাঠামোয় কার্যকর হবে এই বড় মাপের পুনর্গঠন।
School Syllabus Change: সরকারি স্কুলের সিলেবাসে বদল
রাজ্যের স্কুল শিক্ষায় এক দীর্ঘমেয়াদী ‘রোডম্যাপ’ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন জানিয়েছেন, আগের মতো তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে শিক্ষাবিদদের পরামর্শ মেনে ধাপে ধাপে এই পরিবর্তন আনা হবে।
- ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ: সময়ের স্বল্পতার কারণে এখনই নতুন বই আসছে না। ২০২৭ সালে বর্তমান বইগুলিই বহাল রেখে মূলত পর্যালোচনা বা ‘রিভিউ’ করা হবে। প্রথা মেনে ২ জানুয়ারি ‘বই দিবস’-এর আগেই শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দেওয়া হবে।
- ২০২৮ শিক্ষাবর্ষ: ২০২৮ সালে প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ স্কুল সিলেবাসে আমূল রূপান্তর ঘটানো হবে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ (NEP)-র সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি হবে আধুনিক পাঠ্যক্রম।
সল্টলেকে সিলেবাস কমিটির মেগা বৈঠক
সল্টলেকের বিদ্যাসাগর ভবনে নবগঠিত সিলেবাস কমিটির প্রথম বৈঠকেই শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারিত হয়। উক্ত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন:
- স্কুল শিক্ষামন্ত্রী: দীপক বর্মন
- উচ্চ শিক্ষামন্ত্রী: জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়
- শিক্ষা দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রি: কৌশিক চৌধুরী
- তথ্যপ্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক্স মন্ত্রী: কল্যাণ চক্রবর্তী
- শিক্ষা সচিব: বিনোদ কুমার
- সিলেবাস কমিটি নেতৃত্ব: কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক দেবাশিস চট্টোপাধ্যায় এবং বিশিষ্ট সদস্য অরিন্দম ব্যানার্জীসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও শীর্ষ শিক্ষা আধিকারিকগণ।
- বিশেষ আমন্ত্রিত অতিথি: বর্ষীয়ান শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তথাগত রায়।
অবশ্যই পড়ুন: APAAR Card: স্কুল পড়ুয়াদের জন্য বাধ্যতামূলক ‘আপার আইডি’! সিদ্ধান্ত শিক্ষা দপ্তরের
পুরনো সিলেবাস বাতিল এবং নতুন সিলেবাস উদ্ভাবন
বিতর্কিত ও রাজনীতি-প্রভাবিত পুরনো পাঠ্যক্রম ছেঁটে ফেলে এক সম্পূর্ণ নতুন, বিজ্ঞানমনস্ক ও ভীতিমুক্ত পাঠ্যসূচি উদ্ভাবন করা হচ্ছে।
- রাজনীতিমুক্ত পাঠ্যক্রম: পাঠ্যবইয়ে সিঙ্গুর আন্দোলন বা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের উপস্থিতি যুক্তিসঙ্গত কি না, তা সম্পূর্ণভাবে সিলেবাস কমিটির ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন, পাঠ্যক্রমে দলীয় রাজনীতি থাকবে না, থাকবে তথ্য ও বিজ্ঞান মনস্কতা।
- ঐতিহ্য ও ভাষার সমাহার: ‘রামধনু’র মতো শব্দের যথার্থতা নির্ণয় করবে বিশেষজ্ঞ কমিটিই। পাশাপাশি, ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলির গুণগত মান বৃদ্ধি, সংস্কৃত ভাষাকে নতুন করে জনপ্রিয় করা এবং স্কুলের ইউনিফর্মে নিজস্ব ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার (নীল-সাদা পোশাক ও নির্দিষ্ট লোগোর বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া) সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
‘পাস-ফেল’ প্রথা ও সেমিস্টার পদ্ধতি ফেরানোর ভাবনা
শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং পড়ুয়াদের মূল্যায়ন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে দুটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সক্রিয় চিন্তা-ভাবনা করছে সিলেবাস কমিটি:
- পাস-ফেল প্রথার প্রত্যাবর্তন: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার ভিত মজবুত করতে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিখন-দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পুনরায় ‘পাস-ফেল’ প্রথা ফিরিয়ে আনার বিষয়টি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
- সেমিস্টার পদ্ধতির সংযোজন: উচ্চমাধ্যমিকের মতো নিম্ন-মাধ্যমিক পর্যায় থেকেও সেমিস্টারভিত্তিক পরীক্ষা চালু করা যায় কিনা, তা নিয়ে জাতীয় শিক্ষানীতির নির্দেশিকা মেনে চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি করছে বিশেষজ্ঞ কমিটি।
জেনে রাখুন! Biometric Attendance: স্কুল পড়ুয়াদের বায়োমেট্রিক হাজিরা! উপস্থিতি কম হলে বসতে পারবে না পরীক্ষায়
২০২৮ সাল থেকে শুরু হতে চলা এই নতুন পাঠ্যক্রম রাজ্যের শিক্ষাক্ষেত্রে এক নতুন ভোরের সূচনা করবে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও যুগোপযোগী সিলেবাসের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষার্থীরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করছে শিক্ষা মহল।
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম গ্রুপে যুক্ত হোন -

