সুকান্ত ভট্টাচার্য – প্রবন্ধ রচনা | আজ তোমাদের জন্য নিয়ে এলাম বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল, প্রতিবাদী ও চিরতরুণ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য-এর উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ রচনা। স্বল্পায়ু জীবন হলেও তাঁর কবিতায় ধরা পড়েছে শোষণ, অনাহার, যুদ্ধ ও সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ।
উচ্চমাধ্যমিকসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সুকান্ত ভট্টাচার্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তাই যারা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছ, তারা এই প্রবন্ধটি মনোযোগ দিয়ে পড়ো এবং অবশ্যই সংগ্রহ করে রাখো—নম্বর তোলার জন্য এটা অবহেলা করার মতো লেখা নয়।
প্রবন্ধ রচনা : কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য
“একুশ বছরের ছোট্ট জীবন, যেন এক জ্বলন্ত মশাল, বাংলা কবিতায় তুমিই আনলে বিদ্রোহের এক নতুন সকাল।”
বাংলা সাহিত্যের আকাশে সুকান্ত ভট্টাচার্য হলেন এক ধূমকেতুর মতো। রবীন্দ্র-নজরুল পরবর্তী যুগে যে কয়েকজন কবি তাঁদের নিজস্ব স্বর ও ভঙ্গি নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন, সুকান্ত তাঁদের মধ্যে অন্যতম। মাত্র একুশ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি যা দিয়ে গেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে বিরল। তিনি ছিলেন শোষিত, বঞ্চিত ও মেহনতি মানুষের কবি। তাই তাঁকে ‘গণকবি’ বা ‘কিশোর কবি’ বলা হয়।
জন্ম ও বংশপরিচয়:
১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই আগস্ট (ভারতের স্বাধীনতা দিবসের ঠিক ২১ বছর আগে একই তারিখে) কলকাতায় মাতুলালয়ে সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্ম হয়। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার কোটালীপাড়ায়। তাঁর পিতার নাম নিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্য এবং মাতা সুনীতি দেবী। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হলেও তাঁর চিন্তাভাবনা ছিল আকাশচুম্বী।
ছাত্রজীবন ও রাজনীতি:
সুকান্তের পড়াশোনা শুরু হয় কলকাতার কমলা বিদ্যামন্দিরে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও সমাজসচেতন। স্কুলের ধরাবাঁধা পড়াশোনার চেয়ে বাইরের জগত তাঁকে বেশি টানত। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি মার্কসবাদী বা সাম্যবাদী রাজনীতির সংস্পর্শে আসেন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং কমিউনিস্ট পার্টির কাজে তিনি এতটাই জড়িয়ে পড়েন যে, ১৯৪৫ সালে প্রবেশিকা (Matriculation) পরীক্ষায় তিনি অকৃতকার্য হন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি না থাকলেও, তাঁর জ্ঞানের পরিধি ছিল বিশাল।
সাহিত্যিক জীবন ও সৃষ্টি:
খুব ছোট বয়স থেকেই সুকান্তের কলম চলতে শুরু করে। তিনি মূলত অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- ছাড়পত্র (সবচেয়ে বিখ্যাত)
- ঘুম নেই
- পূর্বাভাস
- মিঠে-কড়া (ছোটদের জন্য ছড়া)
- অভিযান
তাঁর লেখা ‘রানার’ কবিতাটি আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। এছাড়াও ‘আঠারো বছর বয়স’, ‘সিঁড়ি’, ‘হে মহাজীবন’ প্রভৃতি কবিতা বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।
কাব্যের বৈশিষ্ট্য ও আদর্শ:
সুকান্ত ছিলেন বাস্তববাদী কবি। ফুল, পাখি বা রোমান্টিক প্রেমের চেয়ে মানুষের ক্ষুধা ও দারিদ্র্য তাঁর কবিতায় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি রোমান্টিকতাকে বিলাসিতা মনে করতেন। তাই তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন—
“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।”তিনি চেয়েছিলেন এমন এক পৃথিবী গড়তে, যেখানে কোনো শিশু না খেয়ে থাকবে না। তাঁর বিখ্যাত উক্তি—
“এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।”অকাল প্রয়াণ:
অতিরিক্ত পরিশ্রম, অনিয়ম এবং দারিদ্র্যের কশাঘাতে কবির শরীর ভেঙে পড়ে। তিনি দুরারোগ্য যক্ষ্মা (TB) রোগে আক্রান্ত হন। সেসময় এই রোগের ভালো চিকিৎসা ছিল না। মাত্র ২১ বছর বয়সে, ১৯৪৭ সালের ১৩ই মে, ভারতের স্বাধীনতার ঠিক কয়েক মাস আগে, এই প্রতিভাবান কবির জীবনাবসান ঘটে। বাংলা সাহিত্য হারায় তার এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে।
উপসংহার:
সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন ঝড়ের পাখি। তিনি এসেছিলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন, কিন্তু থাকার সময় পেলেন না। ইংরেজ কবি জন কিটস (John Keats)-এর মতো তিনিও খুব অল্প বয়সে চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি আজও অমর। যতদিন পৃথিবীতে শোষণ ও বঞ্চনা থাকবে, ততদিন সুকান্তের কবিতা আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে শেখাবে। তিনি চিরকাল ‘কিশোর কবি’ হয়েই বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন।
“থেমেছে হৃদস্পন্দন, থামেনি তো গান, হে কিশোর কবি, তোমায় জানাই সশ্রদ্ধ সম্মান।”
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম Study গ্রুপে যুক্ত হোন -



