রাজা রামমোহন রায় – জীবনী রচনা | ভারতীয় নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ রাজা রামমোহন রায়–এর উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবনী রচনা। সমাজ সংস্কার, শিক্ষার প্রসার এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তাঁর নির্ভীক সংগ্রাম তাঁকে ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এই রচনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নম্বর-বান্ধব।
[প্রবন্ধ রচনা] যুগনায়ক রামমোহন: আধুনিক ভারতের স্থপতি
ভূমিকা
“কুসংস্কারের ঘোর অমানিশায় আচ্ছন্ন ভারতভূমি, জ্ঞানের প্রদীপ হাতে পথ দেখালেন রাজা রামমোহন তুমি।”
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষলগ্নে ভারত যখন কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির অন্ধকারে নিমজ্জিত, তখন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিলন ঘটাতে যে মহামানবের আবির্ভাব ঘটেছিল, তিনি হলেন রাজা রামমোহন রায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে ‘ভারতপথিক’ এবং দিলীপ কুমার বিশ্বাস তাঁকে ‘বিশ্বপথিক’ আখ্যা দিয়েছেন। আধুনিক ভারতের রূপকার হিসেবে তিনি রাজনীতি, জনপ্রশাসন, ধর্ম ও শিক্ষাক্ষেত্রে যে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিলেন, তার জন্য তাঁকে যথার্থই ‘ভারতের নবজাগরণের অগ্রদূত’ বা ‘জনক’ বলা হয়।
জন্ম ও বংশপরিচয়
১৭৭২ খ্রিস্টাব্দের ২২শে মে (মতান্তরে ১৭৭৪) হুগলি জেলার রাধানগর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত ও রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ পরিবারে রামমোহন রায়ের জন্ম হয়। তাঁর পিতার নাম রামকান্ত রায় এবং মাতা তারিনী দেবী। রামমোহনের পূর্বপুরুষরা মুঘল দরবারে উচ্চপাদে আসীন ছিলেন। তাঁর প্রপিতামহ কৃষ্ণকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় মুঘল বাদশাহ ফারুখসিয়রের আমলে বাংলার সুবেদারের অধীনে ‘আমিন’-এর কাজ করতেন। এই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁরা ‘রায়’ বা ‘রায়রায়ান’ খেতাব পান, যা কালক্রমে তাঁদের পারিবারিক পদবিতে পরিণত হয়।
শিক্ষাজীবন ও পাণ্ডিত্য
বাল্যকাল থেকেই রামমোহনের মধ্যে অসামান্য মেধার পরিচয় পাওয়া যায়। গ্রামের পাঠশালায় তাঁর শিক্ষার হাতেখড়ি হয়। মাত্র ৪ বছর বয়সে তিনি বাংলা ও ফারসি ভাষা শিখতে শুরু করেন। এরপর পাটনায় গিয়ে তিনি আরবি ও ফারসি ভাষায় গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। জ্ঞানপিপাসু রামমোহন মাত্র ১২ বছর বয়সে বারাণসীতে (কাশীধাম) যান এবং সেখানে দীর্ঘ ৪ বছর ধরে সংস্কৃত ভাষা, বেদ ও বেদান্ত শাস্ত্রের ওপর গবেষণা করেন। তিনি বহুভাষাবিদ ছিলেন; ইংরেজি, গ্রিক, হিব্রু, লাতিন ও ফরাসি ভাষাতেও তাঁর সমান দক্ষতা ছিল। এই অগাধ পাণ্ডিত্যই তাঁকে সত্য অনুসন্ধানে সাহায্য করেছিল।
কর্মজীবন
১৭৯৬ সালে পৈতৃক সূত্রে এবং নিজের উপার্জনে তিনি কলকাতার জোড়াসাঁকো অঞ্চলে সম্পত্তির মালিক হন এবং সেখানেই বসবাস শুরু করেন। প্রথম জীবনে তিনি কিছুদিন মহাজনের কাজ এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে ‘ সেরেস্তাদার’ হিসেবে কাজ করেন।
১৮০৩ থেকে ১৮১৪ সাল পর্যন্ত তিনি জন ডিগবি নামক এক ইংরেজ সিভিলিয়ানের অধীনে রংপুরে দেওয়ান হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে চাকরি করা তাঁর স্বভিমানের বিরোধী ছিল। তাই তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমাজ সংস্কার ও সাহিত্য সাধনায় উৎসর্গ করেন।
ধর্ম সংস্কার ও ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা
রামমোহন রায় হিন্দু ধর্মের মূর্তিপূজা ও বহুদেববাদের বিরোধী ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয় (একেশ্বরবাদ)। তিনি বলতেন, “আমি কখনো হিন্দু ধর্মকে আক্রমণ করিনি, আমি শুধু কুসংস্কার ও গোঁড়ামিকে আক্রমণ করেছি।” এই মতবাদ প্রচারের জন্য ১৮১৫ সালে তিনি ‘আত্মীয় সভা’ গঠন করেন। পরবর্তীতে ১৮২৮ সালে তিনি ‘ব্রাহ্ম সভা’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা ১৮৩০ সালে ‘ব্রাহ্মসমাজ’ নামে পরিচিত হয়। তাঁর এই ধর্ম আন্দোলন ভারতীয় সমাজে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
সমাজ সংস্কার ও মানবতা
রামমোহন রায় ছিলেন একজন প্রকৃত মানবতাবাদী। তিনি জাতপাত, অস্পৃশ্যতা, বর্ণভেদ, কৌলিন্য প্রথা ও বাল্যবিবাহের তীব্র বিরোধী ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক সমাজ গড়তে যেখানে নারী-পুরুষ, ধনী-দরিদ্র এবং উচ্চ-নীচ কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। নারীদের পৈতৃক সম্পত্তিতে অধিকার দেওয়ার কথাও তিনি প্রথম বলেছিলেন। সমাজের হাজারো লাঞ্ছনা সহ্য করেও তিনি কুসংস্কারের বিরুদ্ধে একাই লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন।
সতীদাহ প্রথা নিবারণ (ঐতিহাসিক কীর্তি)
“চিতার আগুনে পুড়বে না আর জ্যান্ত মেয়ের প্রাণ, হে মহাপ্রাণ, তুমিই দিলে তাদের বাঁচার সম্মান।”
রাজা রামমোহন রায়ের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো সতীদাহ প্রথা রদ করা। সে যুগে হিন্দু সমাজে স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা স্ত্রীকে জ্যান্ত চিতায় পুড়িয়ে মারা হতো। এই পৈশাচিক প্রথার বিরুদ্ধে রামমোহন রায় গর্জে ওঠেন। তিনি শাস্ত্র উদ্ধৃত করে প্রমাণ করেন যে, ধর্মে সতীদাহের কোনো বিধান নেই। গোঁড়া হিন্দু সমাজের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি আন্দোলন চালিয়ে যান। অবশেষে তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় এবং তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের সহায়তায় ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে ‘১৭ নম্বর রেগুলেশন’ (Regulation XVII) আইন জারি করে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করা হয়। লক্ষ লক্ষ নারীর প্রাণ রক্ষা পায় তাঁর এই মহানুভবতায়।
শিক্ষা সংস্কার
রামমোহন বুঝেছিলেন, আধুনিক বিজ্ঞান ও ইংরেজি শিক্ষা ছাড়া ভারতীয়দের উন্নতি অসম্ভব। তাই তিনি সংস্কৃত শিক্ষার বদলে ইংরেজি শিক্ষার প্রসারে উদ্যোগী হন। তিনি ১৮১৭ সালে ডেভিড হেয়ারের সঙ্গে মিলে ‘হিন্দু কলেজ’ (বর্তমান প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেন। ১৮২২ সালে তিনি সম্পূর্ণ নিজের খরচে ‘অ্যাংলো-হিন্দু স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও পাশ্চাত্য দর্শন ও ভারতীয় বেদান্তের মেলবন্ধন ঘটাতে ১৮২৬ সালে তিনি ‘বেদান্ত কলেজ’ স্থাপন করেন।
‘রাজা’ উপাধি ও বিদেশ যাত্রা
রামমোহন রায় ছিলেন প্রথম ভারতীয় ব্রাহ্মণ যিনি সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বিলেতে গিয়েছিলেন। ১৮৩০ সালে দিল্লির মুঘল বাদশাহ দ্বিতীয় আকবর তাঁকে নিজের দূত হিসেবে ইংল্যান্ডে পাঠান এবং তাঁকে ‘রাজা’ উপাধিতে ভূষিত করেন। মুঘল বাদশাহের ভাতা বৃদ্ধি এবং ভারতের কিছু দাবিদাওয়া ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পেশ করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। সেখানে তিনি বিদ্বজনদের কাছ থেকে প্রচুর সম্মান ও সংবর্ধনা লাভ করেন।
উপসংহার
“রামমোহন তো কোনো বিশেষ দেশের বা কালের নন, তিনি সমস্ত মানবের।” - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরবিলেতে থাকাকালীনই ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দের ২৭শে সেপ্টেম্বর ব্রিস্টল শহরে মেনিনজাইটিস রোগে আক্রান্ত হয়ে এই মহান যুগনায়ক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। রাজা রামমোহন রায় আমাদের শিখিয়েছিলেন অন্ধবিশ্বাস ত্যাগ করে যুক্তির পথে চলতে। তিনি বাংলা গদ্য সাহিত্যেরও জনক ছিলেন। আজকের আধুনিক ভারত তাঁরই স্বপ্নের ফসল।
“তিনি কেবল একজন সমাজ সংস্কারক ছিলেন না, তিনি ছিলেন সেই ভগিরথ, যিনি মরা গাঙে আধুনিকতার জোয়ার এনেছিলেন। তাই আজকের ভারত তাঁর কাছে চিরঋণী।”
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম Study গ্রুপে যুক্ত হোন -



