আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম বিশিষ্ট কবি অজিত দত্ত রচিত ‘সাদা মেঘ কালো পাহাড়’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘নোঙর’ কবিতাটি নবম শ্রেণির পাঠ্যসূচিতে স্থান পেয়েছে। জীবন ও জগতের জটিল আবহে মানুষের এগিয়ে চলার আকাঙ্ক্ষা এবং বাস্তব বাধ্যবাধকতার নিগড়ে আটকে পড়ার এক চিরন্তন দ্বন্দ্ব এই কবিতায় রূপক ছলে ফুটে উঠেছে। কবি এখানে এক স্বপ্নিল সমুদ্রযাত্রার অভিলাষী হলেও তটের কিনারায় আটকে যাওয়া নোঙর তাঁর সেই যাত্রাপথের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| পাঠের নাম | নোঙর |
| কবি | অজিত দত্ত |
| কাব্যগ্রন্থ | সাদা মেঘ কালো পাহাড় |
নোঙর – অজিত দত্ত (নবম শ্রেণী বাংলা কবিতা)
আজকের এই পোস্টে কবি অজিত দত্তের ‘নোঙর’ কবিতাটির উৎস, কবিতার সারাংশ, নামকরণের সার্থকতা এবং অধ্যায়ভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তর খুব সহজ ভাষায় আলোচনা করা হয়েছে।
নোঙর – কবি পরিচিতি
কবি অজিত দত্ত (১৯০৭-১৯৭৯) ছিলেন বাংলা সাহিত্যের রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগের বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান কবি। তিনি ১৯৩০-এর দশকের ‘প্রগতিশীল’ কাব্যধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর কবিতায় রোমান্টিকতা ও বাস্তবতাবোধের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে ‘কুসুমের মাস’, ‘পাতাল কন্যা’, ‘নষ্ট চাঁদ’, ‘সাদা মেঘ কালো পাহাড়’ ইত্যাদি। তিনি ‘প্রগতি’ ও ‘কল্লোল’ গোষ্ঠীর লেখক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর কবিতার চিত্রকল্প এবং গভীর জীবনবোধ পাঠকদের ভাবিয়ে তোলে।
নোঙর কবিতার সারাংশ (Summary)
কবি সুদূর সমুদ্রপারে পাড়ি দেওয়ার এক ব্যাকুল আকাঙ্ক্ষা লালন করেন। তাঁর সেই স্বপ্নের বাণিজ্যের তরীটি নানা সম্ভাবনায় পূর্ণ। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তটের কিনারায় নোঙরটি পড়ে আছে, যা তাঁর তরীকে সমুদ্রের অসীম নীলিমায় ভাসিয়ে নিয়ে যেতে বাধা দিচ্ছে। কবি সারা রাত ধরে অক্লান্তভাবে দাঁড় টেনে চলেন, কিন্তু নোঙরের দৃঢ় বন্ধন তাঁকে একচুলও এগোতে দেয় না।
জোয়ারের সময় ঢেউগুলো ফুলে উঠে তরীর মাথায় আঘাত করে সমুদ্রের দিকে ধাবিত হয়, আর ভাটার টানে সেই জোয়ারের প্রবল প্রাণমত্ততা নিস্তেজ হয়ে পড়ে। জীবননদীর এই জোয়ার-ভাটার দ্বন্দ্বে কবির বাণিজ্য-তটতটে বন্দী হয়ে থাকে। কবি যতই পালে মাসতুলে পাল বাঁধেন বা দাঁড়ের আঘাতে এগোতে চান, সমুদ্রের গর্জনে কবির সমস্ত প্রচেষ্টা বিদ্রূপের মতো শোনায়। প্রতিকূলতা সত্ত্বেও কবি বিরামহীনভাবে তাঁর সাধনার দাঁড় টেনে চলেন। বাস্তব জীবনের হাজারো পিছুটান ও দায়বদ্ধতা মানুষের গতিকে স্তম্ভিত করে দিলেও, মানুষের এগিয়ে যাওয়ার অদম্য বাসনা কোনোদিন শেষ হয় না—এটাই এই কবিতার মূল ব্যঞ্জনা।
নোঙর কবিতার নামকরণের সার্থকতা
সাহিত্যে নামকরণ হলো বিষয়বস্তুর চাবিকাঠি। অজিত দত্তের ‘নোঙর’ কবিতাটির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ‘নোঙর’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো নৌকা বা জাহাজকে স্থির রাখার জন্য ব্যবহৃত লোহার যন্ত্রবিশেষ। কিন্তু কবিতায় এটি একটি গভীর রূপক বহন করছে।
কবি চান সমুদ্রপারে সুদূরের পথে পাড়ি দিতে, যা অজানাকে জানার এক ব্যাকুলতা। কিন্তু তীরে নোঙর পড়ে যাওয়ায় তাঁর সেই যাত্রা থেমে গেছে। এখানে ‘নোঙর’ হলো মানুষের পার্থিব মায়া, সংসার-বন্ধন এবং বাস্তব জীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতীক। মানুষ মনে মনে অসীমে উড়ে যেতে চাইলেও বাস্তবের শিকল তাকে মাটির পৃথিবীতে আটকে রাখে। কবির প্রতিটি প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে নোঙর তাঁকে তটের কিনারে বেঁধে রেখেছে। সমগ্র কবিতার কেন্দ্রীয় ভাবনা এই আবর্তনশীল গতি ও স্থিতির দ্বন্দ্ব যা নোঙরকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। কবিতার শৈল্পিক বিন্যাসে ও ভাববস্তুর বিশ্লেষণে তাই ‘নোঙর’ নামকরণটি অত্যন্ত অর্থবহ ও সার্থক হয়েছে।
নোঙর কবিতার গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ
| শব্দ | অর্থ |
|---|---|
| সিন্ধুপারে | সমুদ্রের ওপারে |
| নোঙর | নৌকা স্থির রাখার লোহার যন্ত্র |
| তট | নদী বা সমুদ্রের তীরের কিনারা |
| দাঁড় | নৌকা চালনার কাঠের দণ্ড |
| তরণী | নৌকা |
| আহরণ | সংগ্রহ করা |
| বাণিজ্য-তরী | পণ্যবাহী নৌকা |
| পাল | নৌকা চালানোর কাপড় |
| মাস্তুল | জাহাজ বা নৌকার পাল খাটানোর দণ্ড |
| কাছি | মোটা দড়ি |
| নিস্তব্ধ | নিশ্চুপ বা নিঝুম |
| বিদ্রূপ | উপহাস বা ঠাট্টা |
| দিগনিশানা | দিক নির্ণয়ের চিহ্ন |
| বিরামহীন | অবিরাম বা নিরন্তর |
| সপ্তসিন্ধু | পুরাণে উল্লিখিত সাতটি সমুদ্র |
| Details | Link |
|---|---|
| নবম শ্রেণী ও পরবর্তী মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি WhatsApp গ্রুপ |
নোঙর কবিতার প্রশ্ন উত্তর (বহুবিকল্প প্রশ্ন উত্তর) | Class 9 No’ngor MCQ Question Answer
১. ‘নোঙর’ কবিতাটি কার লেখা?
(ক) জীবনানন্দ দাশ
(খ) কবি অজিত দত্ত
(গ) শক্তি চট্টোপাধ্যায়
(ঘ) শঙ্খ ঘোষ
উত্তর: (খ) কবি অজিত দত্ত
২. ‘নোঙর’ কবিতাটি কবির কোন কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত?
(ক) কুসুমের মাস
(খ) সাদা মেঘ কালো পাহাড়
(গ) নষ্ট চাঁদ
(ঘ) পাতাল কন্যা
উত্তর: (খ) সাদা মেঘ কালো পাহাড়
৩. কবি কোথায় পাড়ি দিতে চান?
(ক) গঙ্গার তীরে
(খ) দূর সিন্ধুপারে
(গ) মরুভূমিতে
(ঘ) নিজের গ্রামে
উত্তর: (খ) দূর সিন্ধুপারে
৪. নোঙর কোথায় পড়ে গিয়েছে?
(ক) মাঝ সমুদ্রপথে
(খ) তটের কিনারে
(গ) বালির চড়ায়
(ঘ) মাস্তুলের ডগায়
উত্তর: (খ) তটের কিনারে
৫. কবি সারা রাত ধরে মিছে কী করেন?
(ক) গান শুনছেন
(খ) চিন্তা করছেন
(গ) দাঁড় টানেন
(ঘ) ঘুমিয়ে থাকেন
উত্তর: (গ) দাঁড় টানেন
৬. জোয়ারের ঢেউগুলো কিসে মাথা ঠোকে?
(ক) বালুচরে
(খ) তরীতে
(গ) পালে
(ঘ) মাস্তুলে
উত্তর: (খ) তরীতে
৭. ভাটা কী আহরণ করে?
(ক) জল
(খ) বালু
(গ) স্রোতের প্রবল প্রাণ
(ঘ) পণ্য
উত্তর: (গ) স্রোতের প্রবল প্রাণ
৮. কবির বাণিজ্য-তরী কোথায় বাঁধা পড়ে আছে?
(ক) মাঝসমুদ্রে
(খ) জোয়ার-ভাটায় বাঁধা তটে
(গ) অন্য দেশে
(ঘ) সিন্ধুপারে
উত্তর: (খ) জোয়ার-ভাটায় বাঁধা তটে
৯. কবি যতই কী বাঁধেন মাস্তুলে?
(ক) দড়ি
(খ) কাছি
(গ) পাল
(ঘ) পতাকা
উত্তর: (গ) পাল
১০. নোঙরের কীসের বাঁধনে নৌকাটি চিরকাল বাঁধা থাকবে?
(ক) শিকলে
(খ) জালের
(গ) কাছি দিয়ে
(ঘ) তার দিয়ে
উত্তর: (গ) কাছি দিয়ে
১১. কবি কিসের গর্জন শুনে কেঁপে ওঠেন?
(ক) আকাশের
(খ) পশুর
(গ) সাগরগর্জনে
(ঘ) মেঘের
উত্তর: (গ) সাগরগর্জনে
১২. স্রোতের কী প্রতিবার দাঁড়ের নিক্ষেপে শোনা যায়?
(ক) জয়গান
(খ) করুণ সুর
(গ) বিদ্রূপ
(ঘ) প্রতিধ্বনি
উত্তর: (গ) বিদ্রূপ
১৩. কবি কিসের দিকে চেয়ে দিকের নিশানা করেন?
(ক) কম্পাসের
(খ) চাঁদের
(গ) তারার
(ঘ) লাইটহাউস
উত্তর: (গ) তারার
১৪. কবির দাঁড় টানা কেমন?
(ক) ক্লান্তিকর
(খ) আমোদজনক
(গ) বিরামহীন
(ঘ) অনিয়মিত
উত্তর: (গ) বিরামহীন
১৫. তরীটিতে কী ভরা আছে?
(ক) জল
(খ) সোনা
(গ) পণ্য
(ঘ) যাত্রী
উত্তর: (গ) পণ্য
১৬. কবি নৌকা নিয়ে কোথায় পাড়ি দিতে চান?
(ক) মর্ত্যলোক
(খ) পাতালপুর
(গ) সপ্তসিন্ধুপারে
(ঘ) কৈলাসে
উত্তর: (গ) সপ্তসিন্ধুপারে
১৭. জোয়ারের ঢেউগুলো ফুলে ওঠে কখন?
(ক) সকালে
(খ) সন্ধায়
(গ) জোয়ারের সময়
(ঘ) পূর্ণিমায়
উত্তর: (গ) জোয়ারের সময়
১৮. ‘মিছে দাঁড় টানি’ – এখানে দাঁড় টানা মিছে কেন?
(ক) কবি ক্লান্ত বলে
(খ) নৌকা খুব ভারী বলে
(গ) নোঙর তটের কিনারে পড়ে গেছে বলে
(ঘ) স্রোত নেই বলে
উত্তর: (গ) নোঙর তটের কিনারে পড়ে গেছে বলে
১৯. “নিস্তব্ধ মুহূর্তগুলি কেঁপে ওঠে” কিসের গর্জনে?
(ক) বাঘের গর্জনে
(খ) যুদ্ধের গর্জনে
(গ) সাগরগর্জনে
(ঘ) বৃষ্টির শব্দে
উত্তর: (গ) সাগরগর্জনে
২০. ভাটার শোষণ কীসের ঠিক উল্টো?
(ক) সমুদ্রের
(খ) বাতাসের
(গ) জোয়ারের
(ঘ) বৃষ্টির
উত্তর: (গ) জোয়ারের
২১. কবির ভাবনা অনুযায়ী স্বপ্ন কোথায় নোঙর করে আছে?
(ক) দূর দেশে
(খ) তটের কিনারে
(গ) গভীর জলে
(ঘ) স্মৃতির ভেতরে
উত্তর: (খ) তটের কিনারে
২২. ‘নোঙর’ শব্দটি কবিতায় কতবার ব্যবহৃত হয়েছে?
(ক) একবার
(খ) তিনবার
(গ) চারবার
(ঘ) দুবার
উত্তর: (খ) তিনবার
২৩. মাস্তুলে কবির কী বাঁধার কথা রয়েছে?
(ক) নোঙর
(খ) পাল
(গ) কাছি
(ঘ) দাঁড
উত্তর: (খ) পাল
২৪. “স্রোতের বিদ্রূপ শুনি…”—কখন শোনেন?
(ক) গান গাওয়ার সময়
(খ) ঘুমানোর সময়
(গ) দাঁড়ের নিক্ষেপে
(ঘ) জোয়ার এলে
উত্তর: (গ) দাঁড়ের নিক্ষেপে
২৫. কবি বিরামহীন কী করেন?
(ক) চিন্তা
(খ) গল্প
(গ) দাঁড় টানা
(ঘ) পথ চলা
উত্তর: (গ) দাঁড় টানা
২৬. ‘নোঙর’ কবিতায় মানুষের কোন প্রবৃত্তি প্রকাশ পেয়েছে?
(ক) অলসতা
(খ) ভীরুতা
(গ) অজেয় গতিশীলতা
(ঘ) নিষ্ঠুরতা
উত্তর: (গ) অজেয় গতিশীলতা
২৭. বাণিজ্য-তরণী কিসের প্রতীকাভ?
(ক) ব্যবসার
(খ) ভ্রমণের
(গ) জীবন সাধনার
(ঘ) অর্থের
উত্তর: (গ) জীবন সাধনার
২৮. ‘সিন্ধু’ শব্দের অর্থ হলো—
(ক) নদী
(খ) পুকুর
(গ) সমুদ্র
(ঘ) মরুভূমি
উত্তর: (গ) সমুদ্র
২৯. সপ্তসিন্ধু বলতে কী বোঝায়?
(ক) সাতটি ছোট নদী
(খ) একটি বিরাট সমুদ্র
(গ) সাতটি সমুদ্র
(ঘ) সমুদ্রের সাতটি ঢেউ
উত্তর: (গ) সাতটি সমুদ্র
৩০. নোঙর কবিতার সুর কেমন?
(ক) হাসির
(খ) ক্রোধের
(গ) বিষাদমাখা ও সংকল্পদীপ্ত
(ঘ) ভয়ের
উত্তর: (গ) বিষাদমাখা ও সংকল্পদীপ্ত
| Details | Link |
|---|---|
| নবম শ্রেণী ও পরবর্তী মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি WhatsApp গ্রুপ |
নবম শ্রেণী বাংলা নোঙর কবিতার অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর (SAQ) | Class 9 No’ngor short question answer 1 Mark
১. ‘নোঙর’ কবিতাটি অজিত দত্তের কোন কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত?
উত্তর: নোঙর কবিতাটি অজিত দত্তের ‘সাদা মেঘ কালো পাহাড়’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত।
২. কবি কোথায় পাড়ি দিতে চান?
উত্তর: কবি দূর সিন্ধুপারে সপ্তসিন্ধুর ওপারে পাড়ি দিতে চান।
৩. কবির দাঁড় টানা কেন ‘মিছে’ মনে হয়েছে?
উত্তর: কবির নৌকার নোঙর তটের কিনারায় পড়ে স্থিতু হয়ে আছে, তাই যতোই দাঁড় টানা হোক না কেন নৌকা এগোয় না বলে কবির তা মিছে মনে হয়েছে।
৪. জোয়ারের ঢেউগুলি কী করে?
উত্তর: জোয়ারের ঢেউগুলি ফুলে উঠে কবির বাণিজ্য-তরীতে মাথা ঠুকে আবার সমুদ্রের দিকে ছুটে চলে।
৫. ভাটার শোষণে কী ঘটে?
উত্তর: ভাটার শোষণে স্রোতের প্রবল প্রাণমত্ততা নিস্তেজ হয়ে পড়ে।
৬. কবির নৌকা বা বাণিজ্যের তরীটি কোথায় বাঁধা পড়ে আছে?
উত্তর: কবির বাণিজ্য-তটতটে জোয়ার-ভাটায় বাঁধা তটের কাছে নোঙর পড়ে থাকায় আটকে আছে।
৭. “মাস্তুলে বাঁধি পাল” – পাল বাঁধার উদ্দেশ্য কী?
উত্তর: পাল বাঁধার উদ্দেশ্য হলো বাতাসের সাহায্যে নৌকাটিকে দ্রুত সমুদ্রের অভিমুখে ছুটিয়ে নিয়ে যাওয়া।
৮. নিস্তব্ধ মুহূর্তগুলি কেন কেঁপে ওঠে?
উত্তর: মাঝসমুদ্রের দিগন্তবিস্তৃত সাগরগর্জনে নির্জন ও নিস্তব্ধ মুহূর্তগুলি কেঁপে ওঠে।
৯. কার বিদ্রূপ শোনা যায়?
উত্তর: দাঁড়ের প্রতিটি নিক্ষেপের সময় স্রোতের বিদ্রূপ শোনা যায়।
১০. কবি কিসের দিকে চেয়ে দিকের নিশানা ঠিক করেন?
উত্তর: কবি আকাশের তারার দিকে চেয়ে দিকের নিশানা বা গন্তব্য নির্দিষ্ট করেন।
১১. কবির তরীটিতে কী আছে?
উত্তর: কবির তরীটি বা তরণীটি বিচিত্র পণ্য সম্ভারে ভরা।
১২. কবি কতদিন ধরে দাঁড টানছেন?
উত্তর: কবি সারা রাত ধরে বিরামহীনভাবে দাঁড টেনে চলেছেন।
১৩. কবিতার শেষে কবির আক্ষেপ কী?
উত্তর: কবিতার শেষে কবির আক্ষেপ হলো—যতই তিনি দাঁড টানুন না কেন, নোঙর সেই তটের কাছেই পড়ে থাকে।
১৪. ‘নোঙর’ কিসের প্রতীক?
উত্তর: নোঙর হলো জীবনস্থিতি, সংসারের মায়া-বন্ধন ও জাগতিক প্রতিবন্ধকতার প্রতীক।
১৫. কবির বাণিজ্য-তরী কিসের রূপক?
উত্তর: কবির বাণিজ্য-তরী হলো কবির জীবন ও কাব্যের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার রূপক।
| Details | Link |
|---|---|
| নবম শ্রেণী ও পরবর্তী মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি WhatsApp গ্রুপ |
নবম শ্রেণী বাংলা নোঙর কবিতার ২ নম্বরের প্রশ্ন উত্তর | Class 9 No’ngor 2 Marks Question Answer
১. “নোঙর গিয়েছে পড়ে তটের কিনারে”—উক্তিটির তাৎপর্য লেখো।
উত্তর: কবির স্বপ্ন ছিল অসীম সমুদ্র পাড়ি দেওয়া। কিন্তু তাঁর জীবনের নোঙর অর্থাৎ সংসারের পিছুটান এবং বাস্তব বাধ্যবাধকতা তীরের কাছে আটকে আছে। ফলে কবি মানসিকভাবে সুদূরের অভিলাষী হলেও বাস্তবে এক জায়গায় স্থবির হয়ে আছেন।
২. “সারা রাত মিছে দাঁড় টানি, মিছে দাঁড় টানি”—দাঁড় টানাকে মিছে বলা হয়েছে কেন?
উত্তর: নৌকার নোঙর যদি তোলা না হয়, তবে সারারাত দাঁড় টানলেও নৌকা একচুলও অগ্রসর হবে না। কবির ক্ষেত্রেও জীবনের নানা সীমাবদ্ধতা তাঁকে আটকে রেখেছে, তাই তাঁর সমস্ত চেষ্টা বা পরিশ্রম বৃথা ও মিছে মনে হয়েছে।
৩. জোয়ার-ভাটা কবির অবস্থার ওপর কী প্রভাব ফেলে?
উত্তর: জোয়ারের সময় ঢেউগুলো কবির নৌকায় আঘাত করে সমুদ্রের ডাক দিয়ে যায়, যা মনে আশার সঞ্চার করে। আবার ভাটার টানে সেই মত্ততা হারিয়ে গিয়ে স্তব্ধতা নেমে আসে। এই দুইয়ের দোলাচলেই কবির তরীটি তটের কিনারে বন্দি থাকে।
৪. “স্রোতের বিদ্রূপ শুনি প্রতিবার দাঁড়ের নিক্ষেপে”—স্রোত কেন বিদ্রূপ করে?
উত্তর: কবি যখন আপ্রাণ চেষ্টা করেন দাঁড টেনে তরীটিকে এগিয়ে নিতে, তখন স্রোত তা দেখে ব্যঙ্গ করে। কারণ স্রোত জানে যে নোঙর না তুলে এই গতিহীন প্রয়াস অর্থহীন। কবির এই অসহায় সীমাবদ্ধতাকেই স্রোত উপহাস করে।
৫. “মাস্তুলে বাঁধি পাল”—মাস্তুলে পাল বাঁধলে কী সুবিধা হয়?
উত্তর: মাস্তুলে পাল বাঁধলে বাতাসের প্রবল শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নৌকাকে দ্রুত সমুদ্রের বুকে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। কবি তাঁর জীবন-তরীটিকেও নতুন গতি দিতে চান, তাই তিনি পাল বাঁধার প্রয়াস করেন।
৬. সাগরগর্জন শুনে নিস্তব্ধ মুহূর্তগুলি কেন কেঁপে ওঠে?
উত্তর: কবি যখন তীরের নির্জনতায় একা অবস্থান করেন, তখন সুদূরের বিশাল সমুদ্রের গর্জন তাঁকে চঞ্চল করে তোলে। সেই প্রবল শব্দের দাপটে তাঁর বর্তমানের স্থবির ও নিস্তব্ধ মুহূর্তগুলো অজানা ভয়ে ও আকুলতায় কেঁপে ওঠে।
৭. “দিগনিশানা” বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: আগেকার দিনে নাবিকেরা আকাশের ধ্রুবতারা দেখে পথ চিনতেন। কবিও তাঁর স্বপ্নের গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য তারার দিকে তাকিয়ে সঠিক পথ বা দিক বুঝতে চান। এখানে ‘দিগনিশানা’ হলো জীবনের লক্ষ্য স্থির করা।
৮. কবির তরীটি কীসে পূর্ণ ছিল?
উত্তর: কবির তরীটি পণ্য ভরা ছিল। এই পণ্য বলতে কবির সৃজনশীল প্রতিভা, জীবনের অর্জিত অভিজ্ঞতা ও তাঁর কাব্যের বৈচিত্র্যময় ভাবনাকে বোঝানো হয়েছে।
৯. “নোঙর কখন জানি পড়ে গেছে তটের কিনারে”—এই অনিশ্চয়তার কারণ কী?
উত্তর: মানুষ অজান্তেই সংসারের মায়াজালে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে পড়ে। কখন যে শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে দায়িত্বের নোঙর তাঁর জীবনে গেঁথে গেছে, তা কবি বুঝতে পারেননি। জীবনের এই অমোঘ বাস্তববোধই এখানে অনিশ্চয়তা রূপে ফুটেছে।
১০. বিরামহীন দাঁড় টানা কিসের পরিচয় দেয়?
উত্তর: নোঙর তীরে পড়ে থাকা সত্ত্বেও কবির বিরামহীন দাঁড় টানা তাঁর অপরাজেয় জীবন সংগ্রামের পরিচয় দেয়। পরাজয় নিশ্চিত জেনেও মানুষ যে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা ছাড়ে না, এটি সেই মানসিক দৃঢ়তার প্রতীক।
১১. “তরণী মাথা ঠুকে সমুদ্রে দিকে তারা ছোটে”—কাদের কথা বলা হয়েছে?
উত্তর: এখানে জোয়ারের ঢেউগুলোর কথা বলা হয়েছে। তারা যেন কবির নৌকায় মাথা ঠুকে সমুদ্রের অসীমে ফিরে যাওয়ার আকুলতা প্রকাশ করে।
১২. জোয়ার-ভাটার চক্রে আটকে থাকা বাণিজ্য-তরীর সংকট কী?
উত্তর: জোয়ারের উচ্ছ্বাস ও ভাটার শোষণ—এই প্রতিনিয়ত পরিবর্তন কবির স্থিতিশিল অবস্থাকে বারবার নাড়া দেয় কিন্তু মুক্তি দিতে পারে না। তরীটি পণ্য পূর্ণ হলেও তা কাজে লাগে না।
১৩. কবির ‘সপ্তসিন্ধু’ পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন সফল হয় না কেন?
উত্তর: কবির স্বপ্ন সফল হয় না কারণ তিনি পার্থিব জীবনের মায়া-মমতা ও দায়বদ্ধতারূপী ‘নোঙর’ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারেননি।
১৪. “মিছে দাঁড় টানি”—একথাটি দুবার ব্যবহারের গুরুত্ব কী?
উত্তর: এই দ্বিরুক্তি কবির ব্যর্থতা ও ক্লান্তির গভীরতাকে নির্দেশ করে। শত চেষ্টা করেও গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারার যে যন্ত্রণা, তা এই কথাটির পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে।
১৫. কবিতার শেষের সুরটি কেমন?
উত্তর: কবিতার শেষের সুরটি বিষাদময় হলেও তাতে এক অসীম সংকল্প বর্তমান। শত ব্যর্থতা সত্ত্বেও দাঁড় টেনে যাওয়ার জেদ জীবনের চলমানতাকে তুলে ধরে।
| Details | Link |
|---|---|
| নবম শ্রেণী ও পরবর্তী মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি WhatsApp গ্রুপ |
নবম শ্রেণী বাংলা নোঙর কবিতার ৩ নম্বরের প্রশ্ন উত্তর | Class 9 No’ngor 3 Marks Question Answer
১. “নোঙর গিয়েছে পড়ে তটের কিনারে”—এই পঙক্তিটির মাধ্যমে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর: ‘নোঙর’ কবিতায় কবি অজিত দত্ত এক গভীর দার্শনিক সত্য তুলে ধরেছেন। জলযানের স্থিতি বজায় রাখার জন্য নোঙর ব্যবহার করা হয়। রূপক অর্থে ‘নোঙর’ হলো মানুষের বাস্তব জীবনের শত সহস্র বন্ধন, সংস্কার এবং পিছুটান। কবি তাঁর স্বপ্ন-তরণী নিয়ে অসীম সমুদ্র পাড়ি দিতে চান। কিন্তু তাঁর অজান্তেই জীবনের নোঙর তটের কিনারায় আটকে গেছে। অর্থাৎ, শিল্পীমন সুদূরের যাত্রী হতে চাইলেও ঘরোয়া জীবন ও পার্থিব দায়িত্ব তাঁকে এক জায়গায় আটকে রেখেছে। এই পঙক্তিটির মাধ্যমে কবি মানুষের মনের উড়ান এবং বাস্তব জীবনের সীমাবদ্ধতার দ্বন্দ্বকেই বুঝিয়েছেন।
২. “সারা রাত মিছে দাঁড় টানি, মিছে দাঁড় টানি”—কবি কেন এই পঙক্তিটি ব্যবহার করেছেন?
উত্তর: কবি যখন সুদূর সমুদ্রপারে বাণিজ্যের তরী নিয়ে যেতে চান, তখন তিনি সারা রাত ধরে পরিশ্রম করে দাঁড় টেনে চলেন। কিন্তু তিনি বিস্মৃত হয়েছেন যে তরীর নোঙরটি তটের কিনারায় বিদ্ধ হয়ে আছে। নোঙর না তুলে দাঁড় টানা যেমন বৃথা পরিশ্রম, তেমনি জীবনের মায়া-বন্ধন ছিন্ন না করে মুক্তির স্বাদ পাওয়া অসম্ভব। কবি নিজের এই পণ্ডশ্রমকে বিদ্রূপ করার জন্যই ‘মিছে দাঁড় টানি’ কথাটি ব্যবহার করেছেন। এখানে ক্লান্তি, নৈরাশ্য এবং সেই সঙ্গে নিজের অবস্থার প্রতি এক বিষণ্ণ হাহাকার ফুটে উঠেছে।
৩. “জোয়ারের ঢেউগুলি ফুলে ফুলে ওঠে”—জোয়ারের ঢেউয়ের প্রভাব বা গুরুত্ব বর্ণনা করো।
উত্তর: জোয়ারের সময় সমুদ্রের জল যখন উদ্বেল হয়ে তীরে আছড়ে পড়ে, তখন কবির মনে হয় ঢেউগুলো তাঁর নৌকায় মাথা ঠুকে সমূদ্রের দিকে ফিরে যাচ্ছে। এই ঢেউগুলো যেন অসীমের ডাক নিয়ে আসে। এরা প্রাণ চাঞ্চল্যের প্রতীক। কবির বাণিজ্য-তরীটি এই জোয়ারের ধাক্কায় দুলে ওঠে, যা তাঁর মনে ক্ষণিকের জন্য আশার আলো দেখায় যে তিনি হয়তো এবার সমুদ্রের অনন্ত পথে ভেসে পড়তে পারবেন। কিন্তু জোয়ারের পরেই শুরু হয় ভাটার শোষণ, যা এই উদ্দীপনাকে শুষে নেয়।
৪. “স্রোতের বিদ্রূপ শুনি প্রতিবার দাঁড়ের নিক্ষেপে”—স্রোত কেন এবং কীভাবে বিদ্রূপ করে?
উত্তর: কবি যখন আপ্রাণ চেষ্টায় দাঁড় ফেলে নৌকাটিকে সামনের দিকে ঠেলে দিতে চান, তখন সেই দাঁড়ের নিক্ষেপে যে জলতরঙ্গ ওঠে, তা যেন কবির ব্যর্থতাকে বিদ্রূপ করে। স্রোত স্থির জানে যে কবির তরীটি নোঙরের বন্ধনে বন্দি। এই বন্ধনহীন মুক্তির পথে অগ্রসর হওয়ার বিফল প্রয়াসকে স্রোত উপহাসের যোগ্য বলে মনে করে। দাঁড়ের প্রতিটি আওয়াজ যেন কবিকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে তাঁর সকল শ্রম পণ্ড হচ্ছে। এইভাবে প্রকৃতির শক্তির কাছে কবির অসহায়তাকেই স্রোতের বিদ্রূপ বলা হয়েছে।
৫. “নৌকাটি চিরকাল কাছি-বাঁধা থাকে কেন?”—তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: নৌকাটি নোঙরের কাছের সঙ্গে চিরকাল বাঁধা থাকার অর্থ হলো মানুষের শাশ্বত একমুখী জীবনধারা। মানুষ মাত্রই সুদূরের পিয়াসী, সে নতুন কিছু করতে চায়, পুরনো গণ্ডি ভাঙতে চায়। কিন্তু মানুষের চারপাশ ঘিরে থাকে পরিবারের স্নেহ, সমাজের বন্ধন এবং জীবিকার তাগিদ। এই জাগতিক টানগুলোই হলো ‘কাছি’। মানুষ এই মায়ার বাঁধন ছিন্ন করতে পারে না বলেই তাঁর জীবনের তরীটি আজীবন তটের কিনারে বা পরিচিত গণ্ডির মধ্যে বন্দি থাকে।
| Details | Link |
|---|---|
| নবম শ্রেণী ও পরবর্তী মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি WhatsApp গ্রুপ |
নবম শ্রেণী বাংলা নোঙর কবিতার বড়ো প্রশ্ন ও উত্তর | Class 9 Bengali No’ngor 5 Marks Important Question Answer
১. ‘নোঙর’ কবিতা অবলম্বনে কবির মানসিক দ্বন্দ্ব এবং অসম্পূর্ণ কামনার যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা আলোচনা করো।
উত্তর: অজিত দত্তের ‘নোঙর’ হলো এক রূপকধর্মী কবিতা। এই কবিতায় এক নাবিক কবির রূপকের মাধ্যমে মানুষের সুদূরবিস্তৃত ইচ্ছা এবং তা বাস্তবায়নের পথে প্রতিবন্ধকতার এক নিবিড় দ্বন্দ্ব রূপায়িত হয়েছে।
মানসিক দ্বন্দ্ব: কবি চান তাঁর বিচিত্র পণ্যবাহী বাণিজ্য-তরী নিয়ে সপ্তসিন্ধুপারে সপ্তসিন্ধুর মহিমায় ভেসে যেতে। এটি মূলত অজানা ও অজানার প্রতি মানুষের চিরন্তন আকর্ষণের প্রতীক। কিন্তু কবির তরীটি তটের কিনারে নোঙর করা। এই নোঙর হলো জীবনস্থিতি ও সাংসারিক পরাধীনতার রূপক। কবির মন যখন অসীমের টানে চঞ্চল, তাঁর শরীর ও কর্ম তখন বাস্তব পৃথিবীর বন্ধনে বন্দি। কবির দাঁড় টেনে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা এবং স্রোতের বিদ্রূপ কবির ভেতরের এই রক্তাক্ত দ্বন্দ্বকেই স্পষ্ট করে তোলে।
অসম্পূর্ণ কামনা: কবি সারা রাত অক্লান্তভাবে দাঁড় টানেন, মাস্তুলে পাল বাঁধেন, কিন্তু গন্তব্য একই জায়গায় স্থির থাকে। জোয়ারের ঢেউরা ডাক দিয়ে গেলেও ভাটার শোষণ সব গতিকে হরণ করে নেয়। স্বপ্ন ও বাস্তবের এই অসম লড়াইয়ে কবির কামনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কিন্তু বিস্ময়করভাবে কবি হাল ছাড়েন না। নোঙর না ওঠা সত্ত্বেও তিনি অবিরাম দাঁড টেনে চলেন। এই বিরামহীন প্রয়াস প্রমাণ করে যে, মানুষের জয় গন্তব্যস্থলে পৌঁছানোর মধ্যে নয়, বরং পৌঁছানোর নিরন্তর সংগ্রামের মধ্যেই নিহিত।
২. ‘নোঙর’ শব্দের আভিধানিক এবং রূপক অর্থ বিচার করে কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
উত্তর: নামকরণের মাধ্যমেই কোনো রচনার মূল ভাববস্তু সুনিশ্চিত হয়। অজিত দত্তের ‘নোঙর’ কবিতাটির নামকরণ বিষয়বস্তুর বিচারে এক অনন্য মাত্রায় পৌঁছেছে।
আভিধানিক অর্থ: আভিধানিকভাবে ‘নোঙর’ হলো লোহা দিয়ে তৈরি এক প্রকার বাঁকানো যন্ত্র যা জলার ওপর নৌকা বা জাহাজকে স্থিরভাবে ধরে রাখতে ব্যবহৃত হয়। কবিতায় আমরা দেখি একটি তরী তটের কিনারে নোঙর করা অবস্থায় আছে, যে কারণে দাঁড় টেনেও তাকে সমুদ্রের দিকে নিয়ে যাওয়া যাচ্ছে না।
রূপক অর্থ: তবে কবিতাটির গূঢ় ভাব অত্যন্ত গভীর। কবি এখানে নোঙরকে মানুষের সামাজিক ও সাংসারিক পিছুটানের বা মায়া-বন্ধনের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। মানুষ যখনই ঘর ছেড়ে সুদূরের অজানাকে চিনতে চায়, তখনই নোঙররূপী দায়-দায়িত্ব তাকে শেকলের মতো আটকে ধরে। জোয়ার-ভাটার মতো জীবনে চড়াই-উতরাই এলেও নোঙরের জন্য মানুষ স্থবির হয়ে থাকে।
সার্থকতা: সমগ্র কবিতায় কবি তাঁর স্বপ্নের বাণিজ্য-তরণী নিয়ে পাড়ি দেওয়ার যে আকুতি দেখিয়েছেন, তার প্রধান অন্তরায় হলো এই নোঙর। কবির দাঁড টানা, সাগরগর্ভন বা দিগনশানা—সবই এই নোঙরের উপস্থিতির কারণে এক আবর্তনশীল চক্রে ঘুরতে থাকে। যেহেতু নোঙরই কবিতার কেন্দ্রীয় সংকট এবং এই রূপকটি ঘিরে ভাববস্তু আবর্তিত হয়েছে, তাই ‘নোঙর’ নামকরণটি সার্থক ও ব্যঞ্জনাধর্মী।
৩. “তরণী ভরা পণ্য নিয়ে পাড়ি দিতে সপ্তসিন্ধুপারে / নোঙর কখন জানি পড়ে গেছে তটের কিনারে” – পঙক্তি দুটির প্রেক্ষাপটসহ অন্তর্নিহিত অর্থ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: প্রেক্ষাপট: আলোচ্য পঙক্তি দুটি কবি অজিত দত্তের ‘নোঙর’ কবিতা থেকে সংগৃহীত। কবি তাঁর স্বপ্নের তরণী সাজিয়ে সুদূরের সমুদ্রযাত্রা করতে উন্মুখ ছিলেন, ঠিক সেই সময়ে নোঙরের বাঁধন যে তাঁর যাত্রা থামিয়ে দিয়েছে, সেই আক্ষেপই এখানে ফুটে উঠেছে।
অন্তর্নিহিত অর্থ: এই চরণ দুটিতে ‘বাণিজ্য-তরী’ ও ‘পণ্য’ এক নিবিড় ইশারা বহন করে। একজন স্রষ্টা বা কবির কাছে তাঁর পণ্য হলো তাঁর সৃষ্টিশীলতা, তাঁর অর্জিত জ্ঞান এবং জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা। কবি চান এই সৃষ্টির ডালি নিয়ে পৃথিবীর দিগ দিগন্তে ছড়িয়ে পড়তে, মানবতার জয়গান গাইতে। ‘সপ্তসিন্ধু’ বলতে অসীম বিশ্বকে বোঝানো হয়েছে।
কিন্তু মানুষ হীনমন্যতা ও অলসতার বশবর্তী হয়ে হোক বা সাংসারিক প্রয়োজনেই হোক—কখন যে তার জীবনের নোঙর তটের মতো সংকীর্ণ জায়গায় গেঁথে যায়, সে বুঝতেও পারে না। অসীমের ডাক সত্ত্বেও পরিচিত গণ্ডির নিরাপত্তা ও দায়িত্ব তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখে। কবির এই অজান্তে নোঙর পড়ে যাওয়ার ঘটনা প্রতিটি সাধারণ মানুষের জীবনের ট্র্যাজেডি। আমরা অনেক বড় হতে চাইলেও বাস্তবের দাবি আমাদের এক নির্দিষ্ট সীমানায় আটকে রাখে। এই রূপক প্রকাশের মাধ্যমেই কবি পঙক্তি দুটির সার্থকতা তুলে ধরেছেন।
৪. “স্রোতের বিদ্রূপ শুনি প্রতিবার দাঁড়ের নিক্ষেপে”—উক্তিটির ব্যাখ্যা দাও এবং কবির প্রতিক্রিয়ার পরিচয় দাও।
উত্তর: কবি আপ্রাণ চেষ্টায় নৌকার দাঁড যখন জলে নিক্ষেপ করেন, সেখান থেকে যে জলতরঙ্গ ও শব্দ উত্থিত হয়, তা কবির কানে যেন বিদ্রূপের মতো শোনায়। এই বিদ্রূপ কোনো বাইরের শক্তির নয়, বরং কবির নিজের অসহায়ত্বের প্রতিধ্বনি। কারণ তরীটি নোঙরের কাছে তটে আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা। এই অবস্থায় এগিয়ে যাওয়ার ব্যর্থ প্রয়াস দেখে প্রকৃতি বা স্বয়ং স্রোত তাকে উপহাসের চোখে দেখে।
কবির প্রতিক্রিয়া: এই বৈরিতার মুখেও কবি ভেঙে পড়েননি। স্রোতের এই তীক্ষ্ণ উপহাস তরণীর মাস্তুলে নতুন পাল বাঁধার জিদ তৈরি করে। যদিও কবি জানেন তরীটি এগোবে না, তবুও তাঁর স্বপ্নগুলো অসীম সাগরের ডাকে স্পন্দিত হতে থাকে। তিনি আকাশের তারার দিকে চেয়ে দিকের নিশানা স্থির করেন। অর্থাৎ, প্রতিকূলতা সত্ত্বেও লক্ষ্য থেকে তিনি বিচ্যুত হন না। শেষ পর্যন্ত তিনি পরাজয় মেনে নেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর নিরন্তর দাঁড টেনে চলার সিদ্ধান্তটি প্রমাণ করে যে বীরত্ব লক্ষ্যের মধ্যে নয়, সংগ্রামের মধ্যেই বর্তমান।
৫. ‘জোয়ার-ভাটা’ এই কবিতায় কীভাবে জীবনের প্রবাহকে চিত্রিত করেছে?
উত্তর: নোঙর কবিতায় জোয়ার ও ভাটা প্রকৃতির এক অমোঘ শক্তির প্রতীক হিসেবে এসেছে, যা মানব জীবনের বিচিত্র গতিরূপকে চিত্রিত করে।
জোয়ারের ভূমিকা: জোয়ারের ঢেউগুলো যখন সমুদ্র থেকে ফুলে উঠে তটের দিকে ছুটে আসে, তখন তা মানুষের মনের অদম্য আশা, স্বপ্ন ও উদ্যমের প্রতীক বলে মনে হয়। ঢেউগুলো যেন বারবার চিৎকার করে বলতে চায় যে অসীমের ডাক এসেছে, এবার ভেসে পড়া দরকার। কবির মধ্যে তা সাময়িক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
ভাটার ভূমিকা: কিন্তু জোয়ারের পরেই আসে ভাটা। ভাটা যেমন স্রোতের প্রবল প্রাণ মত্ততাকে শুষে নেয়, তেমনি মানুষের জীবনে নেমে আসা অবসাদ, বার্ধক্য বা ব্যর্থতাও সমস্ত অনুপ্রেরণা শুষে নেয়। এই জোয়ার-ভাটার চক্রাবর্তে আমাদের বাণিজ্য-তরীটি একই জায়গায় দুলতে থাকে। এর মাধ্যমে কবি বুঝিয়েছেন যে মানুষের জীবনেও আশা-নিরাশার খেলা চলতে থাকে, কিন্তু তাতে পরিস্থিতির খুব একটা আমূল পরিবর্তন হয় না—বিশেষত যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা নোঙরেরূপী জাগতিক পিছুটান ছিন্ন করতে পারছি।
৬. ‘নোঙর’ কবিতায় আধুনিক মানুষের ক্লান্তি ও অনিরুদ্ধ সাধনার যে রূপ ফুটেছে তা নিজের ভাষায় লেখো।
উত্তর: অজিত দত্তের ‘নোঙর’ কবিতাটি আধুনিক যুগের এক বিষণ্ন দলিলে। আধুনিক মানুষ আজ যান্ত্রিকতা ও নাগরিক জীবনের জটিল আবর্তে আবদ্ধ। তার মন গ্লোবাল দুনিয়া বা সুদূরের দিকে ধাবিত হলেও তার দেহ ও অস্তিত্ব এক ছোট গণ্ডির মধ্যে বন্দি।
ক্লান্তি: কবি ‘মিছে দাঁড় টানি’ কথাটি বারবার বলে আমাদের প্রতিদিনের একঘেঁয়েমি ও ব্যর্থ পরিশ্রমের ক্লান্তিকেই তুলে ধরেছেন। মানুষ প্রতিটি দিন দাঁড টানে বাঁচার তাগিদে, সফল হওয়ার নেশায়; কিন্তু দিনের শেষে দেখা যায় সে সেই একই তটের কিনারে বা একই সামাজিক পরিস্থিতির মধ্যে আটকে আছে। এই অসহায়তাই আধুনিক মানুষের প্রধান ক্লান্তি।
অনিরুদ্ধ সাধনা: কিন্তু এই কবিতার শেষভাগ আমাদের এক নতুন শক্তি সঞ্চার করে। তরী এগোবে না জেনেও কবি বলছেন ‘বিরামহীন এই দাঁড টানা’। এটিই আধুনিক মানুষের বৈশিষ্ট্য—সে হাল ছাড়ে না। অজানার প্রতি তাঁর আকর্ষণ চিরন্তন। দিগ্বিদিক অন্ধকার থাকলেও সে তারার দিকে তাকিয়ে নিশানা ঠিক করার চেষ্টা করে। এই অনিরুদ্ধ সাধনাই সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। বাধা থাকলেও মানুষের এগিয়ে যাওয়ার সংকল্প কখনো শেষ হয় না।
৭. “নিস্তব্ধ মুহূর্তগুলি সাগরগর্জনে ওঠে কেঁপে / …বিরামহীন এই দাঁড় টানা।”—পঙক্তিগুলির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: পঙক্তিগুলির মাধ্যমে এক স্তব্ধতা ও বিশালতার মাঝখানে কবির মানসিক দোলচাল ফুটে উঠেছে। কবির বর্তমান জীবনটি নিস্তব্ধ ও স্থবির, যা সংসারের তটে নোঙর করা। কিন্তু দূর থেকে ভেসে আসা সাগরের উত্তাল গর্জন সেই নিস্তব্ধতাকে ভেঙে দেয়। মানুষের অবচেতন মনে যে সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা থাকে, সমুদ্রের গভীর ডাক তাকে বিচলিত করে তোলে।
সাগরগর্জনের শব্দের পাশে কবির মুহূর্তগুলি যখন কেঁপে ওঠে, তখন তাঁর সামনে নিজের অসহায়তা স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়। স্রোত তাঁকে উপহাস করে, পরিস্থিতির প্রতিকূলতা বেড়ে যায়। কিন্তু কবি বিরামহীনভাবে দাঁড টানার অঙ্গীকার করেন। এখানে ‘বিরামহীন’ শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা না থাকলেও কবির এই প্রচেষ্টাতেই তাঁর মনুষ্যত্বের পরিচয়। এই পঙক্তিগুলি দ্বারা কবি আমাদের শিখিয়েছেন যে, ফলপ্রাপ্তির চেয়ে কর্ম বা সাধনাই মানবজীবনের পরম সত্য।
| Details | Link |
|---|---|
| নবম শ্রেণী ও পরবর্তী মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি WhatsApp গ্রুপ |
আজকের পোস্ট এর মধ্যে অজিত দত্তের কালজয়ী কবিতা ‘নোঙর’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা, কবিতাটির বিষয়বস্তু এবং উত্তর সহ প্রশ্নও আলোচনা করা হল, যেগুলি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বিশেষ ভাবে তোমাদের সহায়ক হয়ে উঠবে।
| Details | Link |
|---|---|
| নবম শ্রেণী অন্যান্য সমস্ত বিষয়ের নোট (Class IX All Notes) |
ক্লাস নাইন বাংলা নোঙর প্রশ্ন উত্তর | নোঙর অজিত দত্ত MCQ ও বড় প্রশ্ন উত্তর | নবম শ্রেণী বাংলা সাজেশন নোঙর | নোঙর কবিতার ৩ ও ৫ নম্বরের প্রশ্ন উত্তর
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম Study গ্রুপে যুক্ত হোন -


