কথাশিল্পী প্রেমেন্দ্র মিত্র রচিত ‘নিরুদ্দেশ’ ছোটগল্পটি নবম শ্রেণির পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এটি মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক গল্প, যেখানে সংবাদপত্রে প্রকাশিত নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা গভীর পারিবারিক ট্র্যাজিডি এবং মানবিক অনুভূতির কথা বলা হয়েছে।
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| পাঠের নাম | নিরুদ্দেশ |
| লেখক | প্রেমেন্দ্র মিত্র |
| গ্রন্থ | প্রেমেন্দ্র মিত্রের ছোটগল্প সংগ্রহ |
নিরুদ্দেশ – প্রেমেন্দ্র মিত্র (নবম শ্রেণী বাংলা ছোটগল্প)
আজকের এই পোস্টে প্রেমেন্দ্র মিত্র রচিত ‘নিরুদ্দেশ’ গল্পটির সারসংক্ষেপ, চরিত্রের বিশ্লেষণ এবং পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর খুব সহজ ভাষায় আলোচনা করা হয়েছে।
নিরুদ্দেশ – লেখক পরিচিতি
প্রেমেন্দ্র মিত্র (১৯০৪-১৯৮৮) ছিলেন একাধারে কবি, ছোটগল্পকার, ঔপন্যাসিক এবং চিত্রপরিচালক। বাংলা সাহিত্যে বিজ্ঞানভিত্তিক গোয়েন্দা চরিত্র ‘ঘনাদা’র স্রষ্টা হিসেবে তিনি অমর হয়ে আছেন। তবে তাঁর কলমে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের সুখ-দুঃখ এবং মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বগুলিও অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে ধরা দিয়েছে। ১৯৫৪ সালে তিনি তাঁর ‘সাগর থেকে ফেরা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য রবীন্দ্র পুরস্কার এবং পরবর্তীকালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার ও পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হন।
নিরুদ্দেশ গল্পের সারাংশ (Summary)
শীতের এক অস্বস্তিকর বাদলার দিনে কথক এবং তাঁর বন্ধু সোমেশ আড্ডায় বসেন। কথক খবরের কাগজে নিরুদ্দেশের একগুচ্ছ বিজ্ঞাপন দেখে সামান্য কৌতুক বোধ করেন। তাঁর মতে, নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপনগুলি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একঘেয়ে—ছেলে বাবার ওপর অভিমান করে ঘর ছাড়ে এবং পরদিন বাবা বিজ্ঞাপন দিয়ে তাঁকে ফিরিয়ে আনেন।
কিন্তু সোমেশ এই বিজ্ঞাপনের পেছনে থাকা গভীর যন্ত্রণার কথা জানেন। তিনি শোভন নামের এক যুবকের কাহিনী শোনান। ধনীবের ঘরের একমাত্র ছেলে শোভন সামান্য তুচ্ছ কারণে বাবার ওপর অভিমান করে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। এরপর খবরের পাতায় বিজ্ঞাপন শুরু হয়—প্রথমে মায়ের কাতর অনুরোধ, তারপর বাবার গম্ভীর আহ্বান, এবং সবশেষে বিপুল পুরস্কারের ঘোষণা। কিন্তু শোভন ফিরে আসে না।
দুই বছর পর একদিন এক যুবক সেই বাড়িতে শোভন বলে দাবি করে ফিরে আসে। নায়েবমশাই তাকে বাধা দেন এবং জানান যে আসল শোভন সাত দিন আগে এক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। বাড়ির কর্তা অর্থাৎ শোভনের বৃদ্ধ বাবাও সেই আগন্তুককে চিনতে পারেন না। কিন্তু গল্পের শেষে এক আশ্চর্য মোড় আসে। জানা যায়, ফিরে আসা যুবকটিই সম্ভবত আসল শোভন ছিল, কিন্তু নায়েবমশাই পরিবারের মঙ্গলের জন্য এবং শোভনের মায়ের শেষ বিদায়কে শান্তিময় করতে এক নাটক তৈরি করেছিলেন। বিজ্ঞাপনের নেপথ্যে থাকা যে ‘ট্র্যাজিডি’, তা সোমেশের বর্ণনার মাধ্যমে মূর্ত হয়ে ওঠে।
নিরুদ্দেশ ছোটগল্পের নামকরণের সার্থকতা
সাহিত্যে নামকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তা গল্পের অন্তর্নিহিত সত্যকে ধারণ করে। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘নিরুদ্দেশ’ গল্পটিতে এই শব্দটি দ্বিমুখী ব্যঞ্জনা তৈরি করেছে।
আক্ষরিক অর্থে, গল্পটি খবরের কাগজের ‘নিরুদ্দেশ’ বিজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করে শুরু হয়। শোভন নামের একটি ছেলের ঘর ছেড়ে নিরুদ্দেশ হওয়া এবং তাকে খুঁজে পাওয়ার দীর্ঘ প্রচেষ্টাই গল্পের মূল বিষয়। কিন্তু রূপক অর্থে, এখানে কেবল শোভনই নিরুদ্দেশ হয়নি, নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে একটি পরিবারের স্বাভাবিক শান্তি এবং বাবা-ছেলের সহজ সম্পর্ক। শেষ পর্যন্ত যখন শোভন ফিরে আসে, তখন সে তার আপন বাড়িতেই আগন্তুক বা ‘নিরুদ্দেশ’ হয়ে যায়। বাবা তাকে চিনতে পারেন না এবং সেও তার অধিকার হারিয়ে ফেলে। মানুষের পরিচয় যখন তার আপনজনের কাছেই হারিয়ে যায়, সেই চরম নিরুদ্দেশের দিকেই গল্পের ইঙ্গিত। তাই বিষয়বস্তুর গভীরতার নিরিখে ‘নিরুদ্দেশ’ নামকরণটি অত্যন্ত সার্থক ও যুক্তিযুক্ত হয়েছে।
নিরুদ্দেশ গল্পের গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ
| শব্দ | অর্থ |
|---|---|
| অস্বস্তিকর | আরামদায়ক নয় এমন |
| শ্লথ | ধীর বা আলগা |
| আস্ফালন | আস্ফাল বা দম্ভপূর্ণ বাক্য |
| অভিমানী | যার মনে অভিমান বা কষ্ট জমা আছে |
| অনুসন্ধান | খোঁজ বা তদন্ত |
| পরিত্রাণ | মুক্তি বা রক্ষা |
| ট্র্যাজিডি | বিয়োগান্তক বা করুণ ঘটনা |
| সাদৃশ্য | মিল বা একরূপতা |
| মুহূর্তকাল | অল্প সময় |
| উদাসীন | নির্লিপ্ত বা ভাবলেশহীন |
| Details | Link |
|---|---|
| নবম শ্রেণী ও পরবর্তী মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি WhatsApp গ্রুপ |
নিরুদ্দেশ পাঠ্যাংশের প্রশ্ন উত্তর (MCQ) | Class 9 Niruddesh MCQ Question Answer
১. ‘নিরুদ্দেশ’ গল্পের লেখক কে?
(ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(খ) প্রেমেন্দ্র মিত্র
(গ) শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
(ঘ) বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
উত্তর: (খ) প্রেমেন্দ্র মিত্র
২. সোমেশ ও কথকের আড্ডার দিনটি কেমন ছিল?
(ক) রৌদ্রোজ্জ্বল
(খ) বসন্তের দিন
(গ) অস্বস্তিকর বাদলার দিন
(ঘ) প্রবল ঝড় বৃষ্টির দিন
উত্তর: (গ) অস্বস্তিকর বাদলার দিন
৩. খবরের কাগজে কিসের বিজ্ঞাপন দেখে গল্পের সূত্রপাত?
(ক) চাকরির
(খ) নিরুদ্দেশের
(গ) পাত্র-পাত্রীর
(ঘ) সিনেমার
উত্তর: (খ) নিরুদ্দেশের
৪. নিরুদ্দেশ গল্পের মূল চরিত্রের নাম কী?
(ক) সোমেশ
(খ) কথক
(গ) শোভন
(ঘ) নায়েবমশাই
উত্তর: (গ) শোভন
৫. শোভন কত বছর পর বাড়িতে ফিরে এসেছিল?
(ক) এক বছর
(খ) দুই বছর
(গ) পাঁচ বছর
(ঘ) দশ বছর
উত্তর: (খ) দুই বছর
৬. বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়েছিল কেন?
(ক) শোভন ফিরে এসেছিল বলে
(খ) টাকা ফুরিয়ে গিয়েছিল বলে
(গ) একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনার সংবাদে
(ঘ) বাবা মারা গিয়েছিলেন বলে
উত্তর: (গ) একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনার সংবাদে
৭. বিজ্ঞাপন দাতা শোভনকে কিসের প্রলোভন দেখিয়েছিলেন?
(ক) চকোলেটের
(খ) পুরস্কারের
(গ) নতুন জামার
(ঘ) বিদেশ ভ্রমণের
উত্তর: (খ) পুরস্কারের
৮. শোভনের বাবার স্বভাব কেমন ছিল?
(ক) খুব নরম
(খ) খিটখিটে ও জেদি
(গ) উদাসীন
(ঘ) খুব হাসিখুশি
উত্তর: (খ) খিটখিটে ও জেদি
৯. নায়েবমশাই আগন্তুক যুবককে কী দিয়েছিলেন?
(ক) মিষ্টি
(খ) জামাকাপড়
(গ) এক তাড়া নোট
(ঘ) মারধর করেছিলেন
উত্তর: (গ) এক তাড়া নোট
১০. সোমেশের কানের কাছে কী ছিল?
(ক) একটা তিল
(খ) একটা কাটা দাগ
(গ) একটা জডুল
(ঘ) একটা দুল
উত্তর: (গ) একটা জডুল
১১. প্রথম বিজ্ঞাপনে কার কাতর অনুরোধ ছিল?
(ক) বাবার
(খ) কাকার
(গ) মায়ের
(ঘ) বোনের
উত্তর: (গ) মায়ের
১২. “কে?” – বৃদ্ধ বাবা এই প্রশ্নটি কাকে করেছিলেন?
(ক) সোমেশকে
(খ) নায়েবমশাইকে
(গ) আগন্তুক যুবককে
(ঘ) ভৃত্যকে
উত্তর: (গ) আগন্তুক যুবককে
১৩. শোভনের মা কেন শয্যা নিয়েছিলেন?
(ক) বার্ধক্যের কারণে
(খ) ছেলের শোকে
(গ) ম্যালেরিয়ায়
(ঘ) দুর্ঘনায় আহত হয়ে
উত্তর: (খ) ছেলের শোকে
১৪. “সোমেশও আজ যেন কেমন হইয়া আসিয়াছে।” – সোমেশ আজ কী খাচ্ছিল?
(ক) চা
(খ) কফি
(গ) সিগারেট
(ঘ) পান
উত্তর: (গ) সিগারেট
১৫. নিরুদ্দেশ বিজ্ঞাপনের ঘরছাড়া ছেলেদের সম্পর্কে কথকের ধারণা কেমন?
(ক) তারা খুব সাহসী
(খ) তারা আসলে চতুর
(গ) তাদের ওপর সহানুভূতি থাকা উচিত
(ঘ) তাদের কৌতুক প্রদীপ হিসেবে ব্যবহার করা যায়
উত্তর: (ঘ) তাদের কৌতুক প্রদীপ হিসেবে ব্যবহার করা যায় (ব্যঙ্গার্থে)
১৬. মায়ের চোখের জল বিজ্ঞাপনে কী হিসেবে দেখা দেয়?
(ক) বিজ্ঞাপন পদ হিসেবে
(খ) অশ্রুসজল অনুরোধ হিসেবে
(গ) কালির ছাপ হিসেবে
(ঘ) পুরস্কারের বিনিময়ে
উত্তর: (খ) অশ্রুসজল অনুরোধ হিসেবে
১৭. নায়েবমশাইয়ের মতে শোভন মারা গেছেন কোথায়?
(ক) ট্রেন দুর্ঘটনায়
(খ) গাড়ি চাপা পড়ে
(গ) জাহাজডুবিতে
(ঘ) হাসপাতালে অসুস্থ হয়ে
উত্তর: (খ) গাড়ি চাপা পড়ে
১৮. নায়েবমশাই যুবককে বাড়ির ভেতরে যেতে দেননি কেন?
(ক) সে চোর ছিল বলে
(খ) বাড়ির গিন্নি তখন মুমূর্ষু ছিলেন বলে
(গ) কর্তা আদেশ দিয়েছিলেন বলে
(ঘ) সে আসল শোভন নয় বলে
উত্তর: (খ) বাড়ির গিন্নি তখন মুমূর্ষু ছিলেন বলে
১৯. সোমেশ গল্পটি শেষ করার পর কী করেছিল?
(ক) কেঁদেছিল
(খ) ঘুমিয়ে পড়েছিল
(গ) মুচকি হেসেছিল
(ঘ) চা চেয়েছিল
উত্তর: (গ) মুচকি হেসেছিল
২০. গল্পের শেষে চা পরিবেশন করেছিল কে?
(ক) কথক নিজে
(খ) সোমেশ
(গ) বাড়ির ভৃত্য (রামরূপ)
(ঘ) সোমেশের মা
উত্তর: (গ) বাড়ির ভৃত্য
২১. শোভনের বাবা বিজ্ঞাপন কোথায় দিতে গিয়েছিলেন?
(ক) থানায়
(খ) সংবাদপত্র অফিসে
(গ) প্রকাশনায়
(ঘ) গ্রামে
উত্তর: (খ) সংবাদপত্র অফিসে
২২. সোমেশ কার হয়ে নিরুদ্দেশের গল্প বলেছিল বলে দাবি করে?
(ক) নিজের
(খ) এক বন্ধুর
(গ) কাল্পনিক এক শোভনের
(ঘ) তার ভাইয়ের
উত্তর: (গ) কাল্পনিক এক শোভনের
২৩. বিজ্ঞাপন দাতার স্বরে সবশেষে কিসের পরিচয় পাওয়া যায়?
(ক) কঠোরতা
(খ) মমতা
(গ) কাতরতা ও পরাজয়
(ঘ) ক্রোধ
উত্তর: (গ) কাতরতা ও পরাজয়
২৪. শোভন বাড়িতে থাকা অবস্থায় কী করার সময় বাবার বকুনি খেয়েছিল?
(ক) খেলাধুলোর সময়
(খ) বই পড়ার সময়
(গ) খেতে বসার সময়
(ঘ) ঘুমানোর সময়
উত্তর: (গ) খেতে বসার সময়
২৫. “বড় জটিল” – কীসের ব্যাপারটি বড় জটিল?
(ক) ব্যবসার
(খ) খবরের কাগজের অফিসের
(গ) নিরুদ্দেশের
(ঘ) বন্ধুত্বের
উত্তর: (খ) খবরের কাগজের অফিসের
২৬. নায়েবমশাই আগন্তুককে কত টাকা দিয়েছিলেন?
(ক) পঞ্চাশ টাকা
(খ) একশ টাকা
(গ) এক তাড়া নোট (পরিমাণ অজানা)
(ঘ) দশ টাকা
উত্তর: (গ) এক তাড়া নোট
| Details | Link |
|---|---|
| নবম শ্রেণী ও পরবর্তী মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি WhatsApp গ্রুপ |
নিরুদ্দেশ গল্পের অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর (SAQ) | Class 9 Niruddesh Short Question Answer SAQ
১. সোমেশ কেন উদাসীনভাবে সিগারেট টানছিল?
উত্তর: শীতের বর্ষার অস্বস্তিকর আবহাওয়া এবং নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা করুণ ট্র্যাজিডির কথা ভেবে সোমেশ উদাসীন ছিল।
২. কথক কেন নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপনগুলোকে ব্যঙ্গ করছিলেন?
উত্তর: খবরের কাগজের নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপনগুলি প্রায়শই একঘেয়ে এবং সামান্য অভিমান ঘটিত মনে হওয়ায় কথক ব্যঙ্গ করছিলেন।
৩. শোভন কেন বাড়ি ছেড়েছিল?
উত্তর: খেতে বসার সময় বাবার তিরস্কার এবং অপমান সহ্য করতে না পেরে অভিমানী শোভন বাড়ি ছেড়েছিল।
৪. প্রথম নিরুদ্দেশ বিজ্ঞাপনে কী আবেদন জানানো হয়েছিল?
উত্তর: প্রথম বিজ্ঞাপনে মায়ের কাতর অনুরোধ ছিল যে বাড়ির দরজা খোলায় আছে, ছেলে যেন ফিরে আসে।
৫. বিজ্ঞাপন দাতা কেন পুরস্কারের অঙ্ক বাড়াতে লাগলেন?
উত্তর: যখন আর কোনো আবেদনেই ছেলে ফিরে এল না, তখন মরিয়া বাবা ছেলের সন্ধান পাওয়ার আশায় ক্রমশ পুরস্কারের অঙ্ক বাড়াতে লাগলেন।
৬. সোমেশের মতে বিজ্ঞাপনের পেছনে থাকা ‘সত্যকার ট্র্যাজিডি’ কী?
উত্তর: সোমেশের মতে, অনেক বিজ্ঞাপন এমন ট্র্যাজিডির সাক্ষী দেয় যেখানে ছেলে হয়তো সত্যি ফেরেন না, অথবা ফিরলেও তিনি অপাংক্তেয় হয়ে যান।
৭. নায়েবমশাই আগন্তুক যুবককে কী বলেছিলেন?
উত্তর: নায়েবমশাই যুবককে বলেছিলেন যে সে যেন চলে যায়, কারণ শোভন গাড়ি চাপা পড়ে মারা গেছে এবং তার বৃদ্ধ মা এখন মুমূর্ষু।
৮. বৃদ্ধ বাবা যুবকটিকে দেখে কী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন?
উত্তর: বৃদ্ধ বাবা যন্ত্রণাক্লিষ্ট চোখে যুবকটির দিকে সামান্য তাকিয়ে কেবল জিজ্ঞেস করেছিলেন—“কে?”, অর্থাৎ তিনি নিজের ছেলেকে চিনতে পারেননি।
৯. সোমেশ কেন গল্প শেষ করে মুচকি হাসল?
উত্তর: সোমেশ সম্ভবত শোভনের গল্পটি নিজের জীবনের ওপর ভিত্তি করেই বলছিল, কিন্তু কথকের কাছে তা নিছক গল্প হিসেবে রাখার জন্য সে হাসল।
১০. নায়েবমশাই যুবককে এক তাড়া নোট দিলেন কেন?
উত্তর: শোভনের মায়ের শান্তি রক্ষা করতে এবং যুবকটিকে (যে সম্ভবত নিজেই শোভন) চিরকালের মতো বিদায় করতে নায়েবমশাই টাকা দিয়েছিলেন।
১১. “অদৃষ্টের নিষ্ঠুর রসিকতা” বলতে লেখক কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: ছেলের খোঁজে পাগল বাবা যখন ছেলেকে ফিরে পেয়েও তাকে ‘পর’ বলে মনে করেন বা চিনতে পারেন না, সেই চরম দুর্ভাগ্যের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
১২. সোমেশের কানের কাছে থাকা জডুল কীসের প্রমাণ?
উত্তর: সোমেশের কানের জডুলটি প্রমাণ করে যে গল্পের শোভন আসলে সোমেশ নিজেই ছিল।
১৩. দ্বিতীয় বিজ্ঞাপনে বাবার ডাকটি কেমন ছিল?
উত্তর: গম্ভীর ও কঠোর হলেও তাতে কর্তব্যের চেয়ে বেশি পরাজয়ের সুর ছিল।
১৪. নায়েবমশাই আগন্তুককে কী অনুরোধ করেছিলেন?
উত্তর: নায়েবমশাই অনুরোধ করেছিলেন যেন যুবকটি আর কখনও এ মুখো না হয়, যাতে মুমূর্ষু মায়ের মনে কোনো গোলমাল না সৃষ্টি হয়।
১৫. বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়েছিল কেন?
উত্তর: নায়েবমশাই সংবাদ দিয়েছিলেন যে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে এমন চেহারার একটি ছেলে দুর্ঘটনায় মারা গেছে।
| Details | Link |
|---|---|
| নবম শ্রেণী ও পরবর্তী মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি WhatsApp গ্রুপ |
নিরুদ্দেশ গল্পের ২ নম্বরের প্রশ্ন উত্তর | Class 9 Niruddesh 2 Marks Question Answer
১. “বিচিত্র এই নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন” – বিজ্ঞাপনগুলিকে বিচিত্র বলা হয়েছে কেন?
উত্তর: নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপনগুলি একদিকে যেমন করুণ আবেদনের সংকলন, অন্যদিকে সেগুলি একটি পৌনঃপুনিক সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সামান্য অভিমানে ঘর ছাড়া থেকে শুরু করে চিরকালীন অন্তর্ধান—সবই এই বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় বলে লেখক এটিকে বিচিত্র বলেছেন।
২. বিজ্ঞাপন দাতা মায়ের আবেদনটি সংক্ষেপে লেখো।
উত্তর: মায়ের আবেদন ছিল অত্যন্ত ব্যথিত—“শোভন, ফিরে এসো। তোমার মা শয্যাগত। তোমার জন্য আমাদের দুয়ার খোলা রয়েছে।” এটি ছিল পুত্রের প্রতি মায়ের অন্ধ বাৎসল্যের ডাক।
৩. “নায়েবমশায়ের কণ্ঠস্বর যেন অস্বাভাবিক মনে হলো” – কেন এমন মনে হয়েছিল?
উত্তর: শোভন বাড়িতে ঢোকার সময় নায়েবমশাই তাকে বাধা দেন। তাঁর স্বর থেকে মনে হচ্ছিল তিনি যুবকটির পরিচয় নিশ্চিতভাবে জেনেও তাকে সরিয়ে দিতে চাইছেন, যা ছিল পরিস্থিতির বিচারে অস্বাভাবিক।
৪. “বর্দ্ধক্যের শ্লথ মুখকে বিকৃত করিয়া দিতেছে” – কি বিকৃত করে দিচ্ছিল?
উত্তর: নিরুদ্দেশ ছেলের শোক এবং তাকে ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা ও সংশয়—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে বৃদ্ধ বাবার মুখের ভাব বেদনাদায়কভাবে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল।
৫. সোমেশ গল্পটি শেষ করে কী বলেছিলেন?
উত্তর: সোমেশ মুচকি হেসে কথককে বলেছিলেন যে গল্প বানানো খুব সহজ কাজ। এতে তিনি আসলে তাঁর নিজ জীবনের চরম ট্র্যাজিডিকে ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
৬. বিজ্ঞাপন দাতা কেন ছেলের ওপর মারমুখী হয়েছিলেন?
উত্তর: খেতে বসার সময় ছেলে লেট আসায় ডিসিপ্লিন মেজার হিসেবে এবং মায়ের আশকারায় ছেলে গোল্লায় যাচ্ছে ভেবে ক্রোধে বাবা ছেলের ওপর মারমুখী হয়েছিলেন।
৭. “গৃহিণীকে ধমক দিয়ে বলেন – মিছিমিছি প্যানপ্যান করো না” – বক্তার এই মানসিকতা বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: এটি বাবার বাইরের কঠোরতার প্রকাশ। মায়ের কান্নায় তিনি ভেতরে বিগলিত হলেও নিজের জেদ ও পৌরুষ বজায় রাখতে তিনি ধমক দিচ্ছিলেন, যদিও তিনি নিজেও গোপনে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ ছিলেন।
৮. সোমেশ কেন কথকের কথায় খুব একটা কৌতূহল দেখাচ্ছিল না?
উত্তর: সোমেশ নিজে নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপনের ভয়াবহ সত্য চাক্ষুষ করেছে বা নিজে সেই পরিস্থিতির শিকার হয়েছে। তাই কথকের কাছে এটি বিনোদনের বিষয় হলেও সোমেশের কাছে তা বেদনার ছিল।
৯. নিরুদ্দেশ বিজ্ঞাপন দেওয়া খবরের কাগজগুলি উল্টে দেখলে কী দেখা যাবে?
উত্তর: খবরের কাগজগুলি উল্টে দেখলে দেখা যাবে একটি নিরুদ্দিষ্ট ছেলের ফেরার করুণ কাহিনী, যা ক্রমশ মায়ের কাকুতি থেকে বাবার পুরস্কারের ঘোষণায় পরিণত হয়েছে।
১০. নায়েবমশাই যুবককে বাড়িতে ঢুকতে দেননি কেন?
উত্তর: বাড়িতে শোভনের মা মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন। অন্য এক যুবককে শোভন বলে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বা কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি করে মায়ের শেষ শান্তিটুকু তিনি নষ্ট করতে চাননি।
১১. “অদৃষ্টের রসিকতা” বলতে এখানে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: যে ছেলেকে ফিরে পাওয়ার জন্য বাবা দুহাত উপুড় করে বিজ্ঞাপন দিয়েছেন, সেই ছেলেই যখন সামনে এসে দাঁড়াল, তখন অভিমানে বা যন্ত্রণায় তিনি তাকে পর বলে মনে করলেন বা চিনতে পারলেন না।
১২. নায়েবমশাই আগন্তুককে কত টাকা দিয়েছিলেন?
উত্তর: টাকার সঠিক পরিমাণ উল্লেখ নেই, তবে একটি বড় অঙ্কের ‘নোটের তাড়া’ নায়েবমশাই যুবককে দিয়েছিলেন যাতে সে বিদায় নেয়।
১৩. বিজ্ঞাপনে ছেলের কী জাতীয় পরিচয় দেওয়া হয়েছিল?
উত্তর: ছিপছিপে গড়ন, দোহারা চেহারা, গায়ের রঙ ফর্সা এবং বয়সের একটি আন্দাজ বিজ্ঞাপনে দেওয়া হয়েছিল।
১৪. সোমেশ কেন সিগারেটটা বারবার ধরাচ্ছিল?
উত্তর: নিজের অতীত যন্ত্রণাকে লুকিয়ে রাখতে এবং অস্বস্তিকর গুমোট আবহাওয়ায় নিজেকে শান্ত রাখতে সোমেশ সিগারেটের ধোঁয়ার আড়ালে লুকাতে চাইছিল।
১৫. “গল্প বানানো সহজ” – সোমেশের এই উক্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্যটি কী?
উত্তর: আসলে সোমেশ নিজেই সেই শোভন। নিজের জীবনের করুণ ট্র্যাজিডি সে কথককে শোনাল, অথচ শেষে একে নিছক ‘গল্প’ বলে উড়িয়ে দিয়ে নিজের আত্মসম্মান বজায় রাখল।
| Details | Link |
|---|---|
| নবম শ্রেণী ও পরবর্তী মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি WhatsApp গ্রুপ |
নিরুদ্দেশ গল্পের ৩ নম্বরের প্রশ্ন উত্তর | Class 9 Niruddesh 3 Marks Question Answer
১. “ঐ বিজ্ঞাপনের পেছনে অনেক সত্যকার ট্র্যাজিডি থাকে” – সোমেশের এই কথাটির তাৎপর্য বুঝিয়ে দাও।
উত্তর: কথকের কাছে নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপনগুলি হাসির খোরাক হলেও সোমেশ জানতেন এর নেপথ্য সত্য। অনেক সময় বাবা-ছেলের অনর্থক জেদের কারণে একটি সাজানো ঘর ভেঙে যায়। ছেলের ফেরার প্রতীক্ষায় বাবা-মা তিলে তিলে ক্ষয় হন। কখনও বা ছেলে ফিরে এসেও তার অধিকার ফিরে পায় না—পরিচয় সংকটে ভোগে। এই যে একটি পরিবারের তিলে তিলে শেষ হয়ে যাওয়া, এটিই হলো সোমেশের ভাষায় ‘সত্যকার ট্র্যাজিডি’।
২. শোভনের বাড়ি ত্যাগ করার সংক্ষিপ্ত প্রেক্ষাপটটি আলোচনা করো।
উত্তর: শোভন ছিল এক খিটখিটে মেজাজ ও জেদি বাবার একমাত্র সন্তান। একদিন খেতে বসার সময় সামান্য দেরি হওয়ায় তার বাবা প্রচণ্ড রাগান্বিত হন এবং তার জীবিকাকে ব্যঙ্গ করেন। মায়ের প্রতি বাবার আক্রোশ এবং তাঁকে অপমান করা দেখে শোভন আর স্থির থাকতে পারেনি। বাবার দেওয়া—“বেড়িয়ে যা” আদেশ তৎক্ষণাৎ পালন করে প্রবল অভিমানে সে নিরুদ্দেশ যাত্রায় বেরিয়ে পড়ে।
৩. বিজ্ঞাপনের বিবর্তন কীভাবে শোভনের বাবার মানসিক পরিবর্তন ফুটিয়ে তোলে?
উত্তর: শুরুতে বিজ্ঞাপনে ছিল মায়ের করুণ আর্তি, যেখানে বাবার কোনো সায় ছিল না। এরপর বিজ্ঞাপন হয় বাবার পক্ষ থেকে—গম্ভীর ও কর্তৃত্বব্যঞ্জক। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞাপনের সুর নমনীয় ও কাতর হয়ে পড়ে। শেষে পুরস্কারের ঘোষণা প্রমাণ করে যে শাসনকর্তা বাবা আজ পরাজিত। তিনি কেবল পিতা হিসেবে তাঁর সন্তানদের ফিরে পেতে চাইছেন। অহংকারের চেয়ে পুত্রের হারানো যন্ত্রণা সেখানে বড় হয়ে উঠেছে।
৪. নায়েবমশাই ও আগন্তুক যুবকের কথোপকথনটি নিজের ভাষায় বর্ণনা করো।
উত্তর: আগন্তুক যুবক শোভন বলে বাড়িতে ঢুকতে চাইলে নায়েবমশাই তাকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে তার এখানে কোনো জায়গা নেই। তিনি জানান যে আসল শোভন মারা গেছে। তবে তিনি ওই যুবকের এবং শোভনের মধ্যেকার আশ্চর্য সাদৃশ্য অস্বীকার করতে পারেননি। যুবকটি কিছু বলতে চাইলে নায়েবমশাই তাকে চুপ করিয়ে দিয়ে এক তাড়া নোট হাতে ধরিয়ে দিয়ে তক্ষুনি বিদায় হতে বলেন, যাতে বাড়ির শান্তিতে বিঘ্ন না ঘটে।
৫. সোমেশের কানের কাছে থাকা জডুলটি গল্পের মোড় ঘোরানোর জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: প্রেমেন্দ্র মিত্র গল্পের শেষে এক আশ্চর্য কৌশল অবলম্বন করেছেন। বর্ণনার শোভনের কানের ডান দিকে একটি জডুল ছিল। সোমেশ যখন পুরো কাহিনীটি শেষ করলেন, তখন কথক দেখতে পেলেন সোমেশের কানেও ঠিক একই জায়গায় একটি জডুল রয়েছে। এর মাধ্যমে পাঠকরা বুঝে নেন যে সোমেশ আসলে তাঁর নিজের কাহিনীই ‘গল্প’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এটি গল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ট্র্যাজেডিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
| Details | Link |
|---|---|
| নবম শ্রেণী ও পরবর্তী মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি WhatsApp গ্রুপ |
নিরুদ্দেশ গল্পের ৫ নম্বরের প্রশ্ন ও উত্তর (বড় প্রশ্ন) | Class 9 Bengali Niruddesh 5 Marks Important Question Answer
১. ‘নিরুদ্দেশ’ গল্প অবলম্বনে শোভনের বাবার চরিত্রের বিবর্তন আলোচনা করো।
উত্তর: প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘নিরুদ্দেশ’ গল্পে শোভনের বাবার চরিত্রটি একটি কঠোর আবরণের নিচে থাকা কোমল পিতৃসত্তার পরিচয় দেয়।
শুরুতে আমরা তাঁকে দেখি একজন অত্যন্ত জেদি, খিটখিটে এবং বদরাগী মানুষ হিসেবে। সামান্য কারণে ছেলেকে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে তিনি তাঁর অহংকারী মনোভাব প্রকাশ করেন। এমনকি গিন্নিকে ধমক দিয়ে তাঁর কঠোরতা বজায় রাখার চেষ্টা করেন। তাঁর কাছে নিয়ম এবং আধিপত্যই ছিল বড় কথা।
কিন্তু শোভন ঘর ছাড়ার পর তাঁর চরিত্রের এই কঠোর তিল তিল করে ভেঙে পড়তে থাকে। সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দেওয়ার প্রক্রিয়ায় তাঁর দীর্ঘশ্বাসের চিহ্ন দেখা যায়। প্রথম দিকে তাঁর স্বরে কর্তৃত্ব থাকলেও ক্রমশ তা মিনতি ও কাতরতায় পর্যবসিত হয়। ছেলের সন্ধানে বিপুল পুরস্কার ঘোষণা করার মাধ্যমে তিনি আসলে নিজের জেদের কাছে নিজের পরাজয়ই স্বীকার করে নেন। গল্পের শেষে যখন তিনি ছেলেকে চিনতে পারেন না বা পরিচয় সংকটে ভোগেন, তখন তাঁর সেই বৃদ্ধ ও রিক্তরূপ আমাদের করুণা উদ্রেক করে। অর্থাৎ জেদি শাসক থেকে একজন রিক্ত ও অসহায় পিতায় তাঁর এই রূপান্তরই চরিত্রটির মূল বৈশিষ্ট্য।
২. “ফিরে আসবার ভয়ানক একটা ট্র্যাজিডির কথা আমি জানি” – বক্তা কে? সেই ভয়ানক ট্র্যাজিডিটির বর্ণনা দাও।
উত্তর: উদ্ধৃত উক্তিটির বক্তা হলো কথকের বন্ধু সোমেশ।
ভয়ানক ট্র্যাজিডির কাহিনী: সোমেশ শোভন নামের এক যুবকের কাহিনী জানান। অভিমানে ঘর ছাড়া শোভন যখন দু-বছর পর ফিরে আসে, তখন সে এক রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। নায়েবমশাই তাকে বাড়িতে ঢুকতে বাধা দেন এবং জানান যে এই বাড়ির সন্তান শোভন দুর্ঘটনায় মারা গেছে। বাড়ির গিন্নি অর্থাৎ শোভনের মা তখন মৃত্যুশয্যায়। নায়েবমশাই চাননি যে কোনো বিতর্ক বা সংশয় নিয়ে মায়ের শেষ প্রহরটি অশান্ত হোক। বৃদ্ধ বাবাও জীর্ণ চোখে তাকে অচেনা মানুষের মতো প্রশ্ন করেন। নায়েবমশাই যুবকটিকে এক তাড়া নোট দিয়ে বিদায় করেন।
এখানে ট্র্যাজিডিটি হলো এই যে—বাড়ির নিজের সন্তান ফিরে এসেও তার প্রাপ্য মর্যাদা বা পরিচয় পেল না। নায়েবমশাই একপ্রকার অর্থের মাধ্যমে তাকে চিরবিদায় দিলেন। পরিচিত গণ্ডিতে সে ব্রাত্য হয়ে পড়ল। এই যে আইডেন্টিটি ক্রাইসিস বা নিজের ঘরেই বহিরাগত হওয়ার যন্ত্রণা, এটিই ছিল সোমেশের বর্ণনার ভয়ানক ট্র্যাজিডি।
৩. ‘নিরুদ্দেশ’ গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
উত্তর: প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘নিরুদ্দেশ’ গল্পটির নামকরণ নিপুণ ও অর্থবহ। নামকরণের সার্থকতা বিচার করতে গেলে বিষয়বস্তুর দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
গল্পের সূত্রপাত ঘটে সংবাদপত্রের নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করে। বিজ্ঞাপনগুলিতে থাকে হারানো সন্তানদের ফেরার করুণ আর্তি। এই আর্তি থেকেই শোভন চরিত্রটির বহির্গমন বা ‘নিরুদ্দেশ’ হওয়ার কাহিনী সোমেশ বর্ণনা করেন। তবে গল্পটি যত এগোয়, আমরা বুঝতে পারি ‘নিরুদ্দেশ’ কেবল দৈহিক অন্তর্ধান নয়। অভিমানী ছেলের বিচ্ছেদ একটি পরিবার থেকে যেন শান্তি ও সহজ সম্পর্ককেও নিরুদ্দেশ করে দিয়েছিল।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজিডি ঘটে গল্পের শেষে। যখন শোভন ফিরে আসে, তখন তাকে নায়েবমশাই চিনতে পারলেও পরিস্থিতির দায়ে তাকে ‘অস্বীকার’ করেন। বৃদ্ধ পিতার স্মৃতি থেকেও যেন ছেলের অবয়ব নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। সোমেশ আসলে শোভন হয়েও তাঁর অতীত পরিচয়ের কাছে আজ নিরুদ্দেশ। তাঁর কানের জডুলই তাঁর একমাত্র পরিচয় হয়ে টিকে থাকে। মানুষের অস্তিত্ব যখন তাঁর আপন আবহে হারিয়ে যায়, সেই মর্মদ্ভদ চিরকালীন নিরুদ্দেশ হওয়ার কাহিনীকেই গল্পকার তুলে ধরেছেন। তাই নাম ও বিষয়বস্তুর সাযুজ্য অত্যন্ত প্রবল ও সার্থক।
৪. নায়েবমশাই কেন যুবকটিকে বিদায় করেছিলেন? তাঁর এই সিদ্ধান্তের ঔচিত্য বিচার করো।
উত্তর: নায়েবমশাই ছিলেন শোভনের বাড়ির বিশ্বস্ত কর্মচারী ও হিতৈষী। তিনি আগন্তুক যুবকটিকে (যে সম্ভবত শোভন নিজেই) বিদায় করেছিলেন প্রবল যন্ত্রণার সাথে। এর প্রধান কারণ ছিল শোভনের মায়ের মুমূর্ষু অবস্থা। মা দীর্ঘ দু-বছর ছেলের শোকে ভুগে মৃত্যু পথযাত্রী। নায়েবমশাই তাকে জানিয়েছেন শোভন মারা গেছে। এই চূড়ান্ত সত্যকে বিশ্বাস করেই তিনি শান্তিতে মরতে চাইছিলেন। হঠাৎ করে শোভন ফিরে এলে বা কোনো গোলমাল তৈরি হলে মায়ের শেষ শান্তিটুকু নষ্ট হতে পারত। এছাড়া নায়েবমশাই পরিবারটিকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন।
সিদ্ধান্তের ঔচিত্য: নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে একজন সন্তানকে তার বাড়ি থেকে সরিয়ে দেওয়া অন্যায় মনে হতে পারে। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করলে নায়েবমশাইয়ের সিদ্ধান্তের সপক্ষে যুক্তি দেওয়া যায়। তিনি ওই আবেগের মুহূর্তে সত্যের চেয়ে মঙ্গলের ওপর বেশি জোর দিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন শোভনের মা যেন অন্তত পুত্রের মৃত্যুর শোককে শান্তিতে বরণ করতে পারেন। আগন্তুককে টাকা দিয়ে সাহায্য করার মাধ্যমে তিনি তাঁর মানবিকতাও প্রকাশ করেছিলেন। যদিও এটি একটি ট্র্যাজেডি, তবুও একটি মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের শেষ সম্মানের জন্য নায়েবমশাইয়ের এই কঠোর সিদ্ধান্তটি ছিল সময়োপযোগী ও পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতীক।
৫. “অবশেষে সোমেশ মুচকি হাসিল” – সোমেশের হাসির তাৎপর্য গল্পের শেষে কী ইঙ্গিত দেয়?
উত্তর: প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘নিরুদ্দেশ’ গল্পের শেষে সোমেশের মুচকি হাসিটি অত্যন্ত রহস্যময় ও তাৎপর্যপূর্ণ। এই হাসির আড়ালে সোমেশ আসলে তাঁর নিজের জীবনের এক গভীর ক্ষতকে ঢেকে রাখার চেষ্টা করেছেন।
সোমেশ যে শোভনের গল্পটি বলছিলেন, সেটি নিছক কোনো বন্ধুর বা কাল্পনিক কাহিনী ছিল না; সেটি ছিল তাঁর নিজেরই জীবনকাহিনী। সোমেশ আসলে সেই যুবক যে বাড়ির অধিকার হারিয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছিল। গল্পের বর্ণনার সঙ্গে সোমেশের কানের জডুলের যে মিল পাওয়া যায়, তা এই সত্যকেই প্রতিষ্ঠিত করে। হাসি দিয়ে সোমেশ কথককে এবং নিজেকে একটি বার্তা দিতে চাইলেন যে—এই জগত ও সমাজ সবকিছুকেই ‘গল্প’ হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত। চোখের জলের ওপারে যে রূঢ় বাস্তব, তা মানুষ সহসা বিশ্বাস করতে চায় না।
এই হাসির মাধ্যমে সোমেশ তাঁর পরিচয় গোপন করলেন, কারণ তিনি জানেন এখন আর শোভন হিসেবে ফিরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। এটি আসলে একধরণের আর্তনাদ বা করুণ উপহাস, যা তাঁর নিজের ভাগ্যের প্রতি। হাসির স্পর্শে তিনি তাঁর ট্র্যাজিডিকে আবৃত করে রাখলেন, যা গল্পের শিল্পগুণকে কয়েক ধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে।
৬. গল্পের শুরুতে এবং শেষে আবহাওয়ার বর্ণনা গল্পের মন মেজাজ তৈরিতে কীভাবে সাহায্য করেছে?
উত্তর: গল্পের শুরুতে লেখক এক অস্বস্তিকর বাদলার শীতের দিনের বর্ণনা দিয়েছেন। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ এবং ম্লান পৃথিবী যেন গল্পের মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণার পটভূমি তৈরি করে দেয়। এই গুমোট আবহাওয়া সোমেশের মনের ভেতরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও বিষণ্ণতাকে প্রকাশ করার জন্য উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করে। সিগারেটের নীল ধোঁয়া এবং বাইরের অস্পষ্ট বৃষ্টির ঝাপটা গল্পটির গূঢ় ট্র্যাজিডিকে রহস্যময় করে তোলে।
আবার গল্পের শেষে শীতের বাদলার সেই ‘শীতল প্রায়ান্ধকার’ এবং অস্বস্তিকর পরিস্থিতির উল্লেখ রয়েছে। সোমেশ যখন তাঁর চরম ট্র্যাজিডির কথা শেষ করেন, তখন বাইরের অন্ধকার ও বৃষ্টির শব্দ পাঠকদের মনে এক বিমূর্ত হাহাকার তৈরি করে। এই প্রাকৃতিক পরিবেশ গল্পের মানবিক যন্ত্রণাকে আরও ঘনীভূত করে। সূচনার অস্বস্তি পরিণতির বিষাদরূপে রূপান্তরিত হয়। আবহাওয়ার এই ধূসরতা গল্পটির ট্র্যাজেডি এবং নিরুদ্দেশের যন্ত্রণাকে এক শৈল্পিক সুষমা দান করেছে।
৭. “নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন এইভাবেই ট্র্যাজিডিতে শেষ হয়” – এই মন্তব্যটির আলোকে বিজ্ঞাপনের নেপথ্য পরিণতির দিকটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ছোটগল্প নিরুদ্দেশে বিজ্ঞাপন কেবল সন্ধানের মাধ্যম নয়, তা একটি পরিণতির ইঙ্গিত। সাধারণত লোকে ভাবে বিজ্ঞাপন দিলেই ছেলে ফিরে আসবে এবং খুশির আবহ তৈরি হবে। কিন্তু সোমেশের মাধ্যমে লেখক এর এক বিপরীত চিত্র দেখিয়েছেন।
সোমেশের মতে বিজ্ঞাপনের শেষ হয়তো হয় কোনো সড়ক দুর্ঘটনার খবরে, অথবা চিরকালীন নীরবতায়। মাঝেমধ্যে ছেলে ফিরে এলেও দেখা যায় তার আসনটি পরিবারের অন্দরে আর ফাঁকা নেই। সামাজিক ও মানসিক পরিবর্তনের ফলে সেই সন্তান ব্রাত্য হয়ে যায়। শোভনের ক্ষেত্রেও বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়েছিল একটি গাড়ি চাপা পড়ার খবরে। বিজ্ঞাপনের লড়াইয়ে জেতা বাবা শেষ পর্যন্ত হেরে গিয়েছিলেন। এই যে একটি সাজানো সম্পর্কের চিরতরে ভেঙে যাওয়া, এবং রক্তের সম্পর্ক থেকেও মুখ ফিরিয়ে নেওয়া—এটিই হলো বিজ্ঞাপনের নেপথ্যে থাকা চরম ট্র্যাজিডি। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের জীবন খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনের মতো সহজ সরল নয়; এর ভেতরে অনেক জটিল ও করুণ পরিণতি লুকিয়ে থাকে।
| Details | Link |
|---|---|
| নবম শ্রেণী ও পরবর্তী মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি WhatsApp গ্রুপ |
আজকের পোস্ট এর মধ্যে নিরুদ্দেশ গল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা, গল্পটির বিষয়বস্তু এবং উত্তর সহ প্রশ্নও আলোচনা করা হল, যেগুলি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বিশেষ ভাবে তোমাদের সহায়ক হয়ে উঠবে।
| Details | Link |
|---|---|
| নবম শ্রেণী অন্যান্য সমস্ত বিষয়ের নোট (Class IX All Notes) |
নবম শ্রেণী বাংলা নিরুদ্দেশ গল্প | প্রেমেন্দ্র মিত্র নিরুদ্দেশ প্রশ্ন উত্তর | নিরুদ্দেশ গল্পের সারাংশ ও বড় প্রশ্ন | Class 9 Bengali Niruddesh Notes | নিরুদ্দেশ ছোটগল্পের গুরুত্বপূর্ণ MCQ ও SAQ।
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম Study গ্রুপে যুক্ত হোন -


