নারায়ণ দেবনাথ – জীবনী রচনা – বাংলা কমিক্স ও কার্টুন জগতের কিংবদন্তি শিল্পী নারায়ণ দেবনাথ–এর উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবনী রচনা। বাঙালির শৈশব, কিশোরবেলা ও কল্পনার জগৎ যাঁর সৃষ্টিতে রঙিন হয়ে উঠেছে, তিনি নিঃসন্দেহে বাংলা জনপ্রিয় সাহিত্যের এক অনন্য নাম।
তাঁর শতবর্ষ উপলক্ষে এই জীবনী রচনা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত উপযোগী। যারা বাংলা সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রস্তুতি নিচ্ছ, তারা এই রচনাটি মনোযোগ দিয়ে পড়ে নাও এবং অবশ্যই সংগ্রহে রাখো—কারণ নারায়ণ দেবনাথকে বাদ দিয়ে আধুনিক বাংলা সাহিত্য সম্পূর্ণ হয় না।
প্রবন্ধ রচনা: শতবর্ষে নারায়ণ দেবনাথ: বাঙালির শৈশব রাঙানো জাদুকর
“নন্টে-ফন্টে, হাঁদা-ভোঁদা আর বাঁটুলের মেলা, তোমার তুলিতেই অমর রঙিন বাঙালির ছেলেবেলা।”
বাঙালি ছোটবেলায় কার্টুন বা কমিকস পড়েনি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। আর বাংলা কমিকস বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ‘বাঁটুল দি গ্রেট’, ‘হাঁদা ভোঁদা’ কিংবা ‘নন্টে ফন্টে’-র ছবি। যিনি তাঁর তুলির জাদুতে এবং অনবদ্য রসবোধে গত সাত দশক ধরে বাঙালি পাঠকদের মাতিয়ে রেখেছিলেন, তিনি হলেন কিংবদন্তি শিল্পী নারায়ণ দেবনাথ। তিনি কেবল একজন শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাঙালির শৈশবের জাদুকর। তাঁর জন্মশতবর্ষে আমরা তাঁকে সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করি।
জন্ম ও বংশপরিচয়:
১৯২৫ সালের ২৫শে নভেম্বর হাওড়ার শিবপুরে এই মহান শিল্পীর জন্ম হয়। তাঁর আদি নিবাস ছিল বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে। এক শিল্পমনা পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা, যা পরবর্তীকালে তাঁর শিল্পীসত্তাকে বিকশিত করতে সাহায্য করেছিল।
শিক্ষাজীবন ও সংগ্রাম:
ছোটবেলা থেকেই আঁকাআঁকির প্রতি তাঁর প্রবল ঝোঁক ছিল। সেই টানেই তিনি আর্ট কলেজে ভর্তি হন পাঁচ বছরের ডিগ্রি কোর্সে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল এবং নানা পারিবারিক কারণে তাঁর সেই প্রথাগত শিক্ষা অসম্পূর্ণই থেকে যায়। ডিগ্রি লাভ করতে না পারলেও, তাঁর প্রতিভার কোনো কমতি ছিল না। জীবনের শুরুতে তিনি অলঙ্কার বা গয়নার নকশা তৈরির কাজও করেছেন।
কমিকস জগতে আবির্ভাব:
নারায়ণ দেবনাথের জীবনের মোড় ঘুরে যায় যখন তিনি ‘দেব সাহিত্য কুটির’-এর সংস্পর্শে আসেন। সেখানকার সম্পাদকমণ্ডলী তাঁকে কমিকস আঁকার জন্য উৎসাহ দেন। তাঁদের উৎসাহে এবং নিজের অদম্য প্রচেষ্টায় তিনি বাংলা সাহিত্যে কমিকসের এক নতুন ধারা প্রবর্তন করেন। এতদিন বিদেশি কমিকসের দাপট ছিল, কিন্তু নারায়ণ দেবনাথ খাঁটি বাঙালি মেজাজে কমিকস তৈরি করে বিপ্লব ঘটান।
অমর সৃষ্টি ও চরিত্র:
নারায়ণ দেবনাথের সৃষ্ট চরিত্রগুলো প্রতিটি বাঙালির ঘরের লোক হয়ে উঠেছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য সৃষ্টিগুলো হলো:
- হাঁদা ভোঁদা: এটি তাঁর প্রথম এবং দীর্ঘতম সময় ধরে চলা কমিক স্ট্রিপ। দুই বন্ধুর খুনসুটি ও দুষ্টুমি এতে খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
- বাঁটুল দি গ্রেট: গোলাপি গেঞ্জি আর কালো প্যান্ট পরা, শক্তিশালী অথচ দয়ালু এই চরিত্রটি বাঙালির একমাত্র নিজস্ব ‘সুপারহিরো’। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঁটুলকে দেশপ্রেমিক হিসেবেও দেখানো হয়েছিল।
- নন্টে ফন্টে: বোর্ডিং স্কুলের দুই ছাত্র এবং তাদের সিনিয়র কেল্টুদার মজার কান্ডকারখানা আজও আমাদের হাসায়।
এছাড়াও তিনি সৃষ্টি করেছেন— ‘ডানপিটে খাঁদু আর তার ক্যামিক্যাল দাদু’, ‘কৌশিক রায়’ (গোয়েন্দা চরিত্র), ‘ম্যাজিসিয়ান পটলচাঁদ’, ‘পেটুক মাস্টার বটুকলাল’, ‘শুটকী আর মুটকী’, ‘বাহাদুর বেড়াল’ প্রভৃতি।
পুরস্কার ও সম্মাননা:
দীর্ঘকাল প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকলেও, জীবনের শেষলগ্নে তিনি বহু সম্মান পেয়েছেন।
- ২০১৩ সালে তিনি মর্যাদাপূর্ণ ‘সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার’ এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মান লাভ করেন।
- ২০২২ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত করে।
জীবনাবসান:
পদ্মশ্রী পাওয়ার খবর শোনার কয়েকদিনের মধ্যেই, ২০২২ সালের ১৮ই জানুয়ারি ৯৬ বছর বয়সে কলকাতায় এই মহান শিল্পী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা শিশুসাহিত্যের একটি যুগের অবসান ঘটে।
উপসংহার: হাসির ভুবনের চিরস্থায়ী সম্রাট
“তুলি থামলেও থামেনি সৃষ্টি, থামেনি মুখের হাসি…”
নারায়ণ দেবনাথ আজ আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি আজও অমর। তাঁর আঁকা কার্টুনগুলোতে কোনো অশ্লীলতা বা হিংসা ছিল না, ছিল কেবল নির্ভেজাল মজা ও হাসির খোরাক। আজকের মোবাইল ও ইন্টারনেটের যুগেও বাঁটুল বা নন্টে-ফন্টের জনপ্রিয়তা এতটুকু কমেনি। যতদিন বাংলা ভাষা ও বাঙালি থাকবে, ততদিন নারায়ণ দেবনাথ আমাদের হৃদয়ে ‘কমিকস সম্রাট’ হয়ে বেঁচে থাকবেন।
“শিল্পীর মৃত্যু হয়, কিন্তু শিল্পের মৃত্যু নেই। নন্টে-ফন্টে কিংবা বাঁটুল দি গ্রেট যতদিন থাকবে, ততদিন বাঙালির হৃদয়ে নারায়ণ দেবনাথ অমর হয়ে থাকবেন।”
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম Study গ্রুপে যুক্ত হোন -



