মহাশ্বেতা দেবী – জীবনী রচনা | আজ তোমাদের জন্য নিয়ে এলাম বাংলা সাহিত্য ও সমাজচেতনার এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, মহাশ্বেতা দেবী-এর জীবনী রচনা। তিনি শুধু একজন খ্যাতনামা সাহিত্যিক নন, বরং আদিবাসী, দলিত ও প্রান্তিক মানুষের অধিকারের জন্য আজীবন সংগ্রাম করা এক নির্ভীক কণ্ঠস্বর।
উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক স্তরসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় মহাশ্বেতা দেবীর জীবন ও কর্ম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তাই যারা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছ, তারা এই জীবনী রচনাটি মনোযোগ দিয়ে পড়ে নাও এবং ভবিষ্যতের জন্য সংগ্রহ করে রাখো।
অরণ্যের অধিকার ও অগ্নিগর্ভ লেখনী: মহাশ্বেতা দেবী জীবনী
ভূমিকা
“হাতির দাঁতের মিনার ছেড়ে ধুলোর পথে যার চলা, আদিবাসী আর শোষিত মানুষের কথাই যার লেখনীতে বলা।”
বাংলা সাহিত্যে এমন কিছু সাহিত্যিক আছেন, যাঁদের মৃত্যু শারীরিক হলেও তাঁদের সৃষ্টি কখনও মৃত্যুবরণ করে না। মহাশ্বেতা দেবী তেমনই এক কালজয়ী সাহিত্যিক। ‘ঝাঁসির রানী’, ‘অরণ্যের অধিকার’, ‘হাজার চুরাশির মা’-র মতো অসামান্য রচনার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যকে শুধু সমৃদ্ধ করেননি, বরং শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের জীবনযন্ত্রণাকে সমাজের সামনে উন্মোচিত করেছেন। তাই বলা যায়—মহাশ্বেতা দেবী মানুষ হিসেবে চলে গেলেও, তাঁর সাহিত্য ও আদর্শ চিরজীবী।
জন্ম ও পিতৃ-মাতৃ পরিচয়
মহাশ্বেতা দেবীর জন্ম ১৪ জানুয়ারি ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। তিনি জন্মগ্রহণ করেন এক সাহিত্যপ্রেমী ও সংস্কৃতিমনস্ক পরিবারে। তাঁর পিতা মনীশ ঘটক ছিলেন একজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক এবং মাতা ধরিত্রী দেবী ছিলেন সমাজসচেতন ও সাহিত্য অনুরাগী নারী। পিতা-মাতার এই সাহিত্য ও মানবিক চেতনার ধারাই মহাশ্বেতা দেবীর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
শিক্ষাজীবন
মহাশ্বেতা দেবীর শিক্ষাজীবন ছিল বিচিত্র ও সমৃদ্ধ। তিনি ঢাকার ইডেন মন্টেসরি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীকালে মেদিনীপুর মিশন স্কুল ও শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করেন। এরপর কলকাতার বেলপাতা বালিকা বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করে ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজি অনার্সসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের পর ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রাইভেটে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এই শিক্ষাই তাঁর চিন্তাধারা ও লেখনীর ভিতকে আরও দৃঢ় করে তোলে।
বিবাহ ও পারিবারিক জীবন
মহাশ্বেতা দেবীর ব্যক্তিগত জীবন ছিল নানা উত্থান-পতনে ভরা। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রখ্যাত অভিনেতা ও নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু এই বিবাহ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি এবং ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। তাঁদের একমাত্র পুত্র নবারুণ ভট্টাচার্য পরবর্তীকালে খ্যাতনামা কবি ও সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত হন। পরে মহাশ্বেতা দেবীর দ্বিতীয় বিবাহ হলেও সেটিও টেকেনি।
বিচিত্রমুখী কর্মজীবন
মহাশ্বেতা দেবীর কর্মজীবন ছিল সংগ্রামময় ও বহুমুখী। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি পদ্মপুকুর ইনস্টিটিউশনে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। জীবনের এক পর্যায়ে তাঁকে চরম দারিদ্র্যের মুখোমুখি হতে হয়। সেই সময় তিনি টিউশনি করা, কাপড় কাচা সাবান বিক্রি করার মতো কাজও করেছেন জীবিকা নির্বাহের জন্য।
পরে ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি ফের শিক্ষকতায় ফিরে আসেন এবং ১৯৬৪ থেকে ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ কুড়ি বছর বিজয়গড় জ্যোতিষ রায় কলেজে অধ্যাপনা করেন। এই সংগ্রামী জীবনই তাঁকে সাধারণ মানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে যায়।
সাহিত্যকর্ম ও রচনাসম্ভার
মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্যজীবন ছিল অত্যন্ত দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ। তাঁর প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ছোটদের পত্রিকা ‘রংমশাল’-এ। ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘ঝাঁসির রানী’ তাঁর প্রথম গ্রন্থ, যা তাঁকে খ্যাতির শিখরে পৌঁছে দেয়। ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘নটী’ প্রকাশিত হয়। প্রায় ষাট বছরের সাহিত্যজীবনে তিনি অসংখ্য উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও কিশোর সাহিত্য রচনা করেন। মোটামুটি প্রায় ৬২টি উপন্যাস ও গল্পগ্রন্থ এবং প্রায় ২৫টি কিশোর গ্রন্থ তাঁর সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। তিনি ‘বর্তিকা’ নামক পত্রিকাও সম্পাদনা করেছেন।
প্রতিভার মূল্যায়ন
“সভ্য সমাজ যাদের দূরে ঠেলে দিয়েছে, সেই শবর-মুন্ডাদের বুকে টেনে নিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন তাদের ‘মা’।”
মহাশ্বেতা দেবী শুধু একজন সাহিত্যিক নন, তিনি ছিলেন এক সক্রিয় সমাজকর্মী। প্রায় চল্লিশ বছর ধরে তিনি আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষের জীবনধারার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের দুঃখ, দারিদ্র্য, শোষণ ও বঞ্চনার চিত্র তিনি সাহিত্যের মাধ্যমে সমাজের সামনে তুলে ধরেছেন। তিনি তাঁদের সন্তানসম মনে করতেন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন নির্ভীকভাবে।
‘অরণ্যের অধিকার’ উপন্যাসে তিনি বিরসা মুন্ডার জীবনকে যেভাবে তুলে ধরেছেন,— “তিনি ইতিহাসকে কেবল বইয়ের পাতায় রাখেননি, তাকে রক্তমাংসের চেহারায় পাঠকের সামনে দাঁড় করিয়েছেন।“
সম্মান ও পুরস্কার
সাহিত্য ও সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের জন্য মহাশ্বেতা দেবী দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বহু সম্মান লাভ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—জ্ঞানপীঠ পুরস্কার, সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার এবং পদ্মশ্রী। তবে তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় সম্মান ছিল শোষিত মানুষের ভালোবাসা ও বিশ্বাস।
উপসংহার
“অরণ্য আজ কাঁদছে দেখো, কাঁদছে জঙ্গলমহল, তুমি আছো সবুজের বুকে, শান্ত কোলাহল।”
পরিশেষে বলা যায়, মহাশ্বেতা দেবী ছিলেন লাজুক মনের কিন্তু অগ্নিময় লেখিকা। তিনি আপসের পথে বিশ্বাসী ছিলেন না। অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর কলম ছিল সদা জাগ্রত। বাংলা সাহিত্যে তিনি এক নতুন মাত্রা যোগ করেছেন—যেখানে সাহিত্য ও সমাজচেতনা একসূত্রে বাঁধা।
“তিনি প্রমাণ করে গেছেন, কলমের কালি বুলেটের চেয়েও শক্তিশালী হতে পারে। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু ‘অরণ্যের অধিকার’-এর লড়াইয়ে তিনি চিরকাল পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবেন।”
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম Study গ্রুপে যুক্ত হোন -



