একটি নদীর আত্মকাহিনী | আজ তোমাদের জন্য নিয়ে এলাম একটি কল্পনাধর্মী অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ প্রবন্ধ — “একটি নদীর আত্মকাহিনী”। নদী পাহাড়ের কোল থেকে জন্ম নিয়ে সমুদ্রের বুকে বিলীন হওয়া পর্যন্ত তার দীর্ঘ যাত্রাপথে জড়িয়ে থাকে মানুষের সুখ-দুঃখ, সংগ্রাম, আশা ও বেদনার অগণিত গল্প।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক সহ বিভিন্ন পরীক্ষায় এই ধরনের আত্মকথনমূলক প্রবন্ধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই যারা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছ, তারা এই প্রবন্ধটি মনোযোগ দিয়ে পড়বে এবং প্রয়োজনে নিজের কাছে সংগ্রহ করে রাখবে।
প্রবন্ধ রচনা: একটি নদীর আত্মকাহিনী
"ওগো নদী, আপন বেগে পাগল-পারা আমি স্তব্ধ চাঁপার তরু গন্ধ-ভরে তন্দ্রাহারা।" — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভূমিকা:
পড়ন্ত বিকেলের রক্তিম আলোয় আমার ঘাটের এক প্রান্তে বসে কে তুমি? কী দেখছ আমার বুকে বয়ে চলা জলের মুকুরে? কী ভাবছ আমার মুখের দিকে চেয়ে? এসো ভাই, আমরা দুজনে দুটো সুখ-দুঃখের কথা কই। আজ আমারটা শোনো, পরে কোনোদিন তোমার কথাও নিশ্চয়ই শুনব। আমি একটি নদী, জন্মাবধি বয়ে চলাই আমার নিয়তি। আজ জীবনের শেষ প্রান্তে, মোহনার কাছাকাছি এসে আমার ফেলে আসা দীর্ঘ যাত্রাপথের কথাই বড্ড মনে পড়ছে।
উদ্ভব:
আজ এতদিন বাদে আমার উদ্ভবের কথা আবছা আবছা মনে পড়ে। আমার জন্ম হয়েছে এক এক ক্ষেত্রে এক এক ভাবে। কখনও পর্বতশীর্ষের গলিত হিমবাহের জলপ্রবাহ একত্রিত হয়ে; কখনও বা কোনো হ্রদ বা অন্য কোনো নদী থেকে।
এক এক দেশে আমার বিভিন্ন প্রবাহ আমাজন, মিসিসিপি-মিসৌরী, টেমস, টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস, নীল, সিন্ধু, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, হোয়াংহো ইত্যাদি বিভিন্ন নামে নামাঙ্কিত হয়েছে। তবে যে নামকরণ করা হোক না কেন আমার মূল সত্তা ও চরিত্র একই। তাই ভারতের মূল নদী যে আমি গঙ্গা নামে যুগ যুগ ধরে বয়ে চলেছি সেই আমার কথাই তোমাদের বলি।
আমার জন্মকথা নিয়ে একটা পৌরাণিক কিংবদন্তি আছে। আমি নাকি ব্রহ্মার কাছে ছিলাম। সগর বংশের পুত্রদের বাঁচানোর জন্য ভগীরথের তপস্যায় আমি মর্ত্যে নেমে এলাম। মর্ত্যে আমার তীব্র বেগ মহাদেব তাঁর মস্তকের জটাজুট জালে ধারণ করেন।
"পিবন্তি নদ্যঃ স্বয়মেব নাম্ভঃ…"
যাত্রাপথের মাঝে তপস্যারত জহ্নু মুনির আশ্রমের সরঞ্জাম ভেসে গেল আমার স্রোতে। মুনি ক্রুদ্ধ হয়ে আমাকে এক গণ্ডূষে পুরোপুরি উদরস্থ করলেন। ভগীরথ পুনরায় তপস্যা করে তাঁকে তুষ্ট করলে, তিনি নিজের জহ্নু কেটে আমাকে মুক্তি দিলেন। জহ্নু থেকে আমার দ্বিতীয় জন্ম হল, তাই আমার নাম জাহ্নবী। তারপর আমার জলধারা পাতালে গিয়ে সগর রাজার পুত্রদের পুনরায় সঞ্জীবিত করল।
গতিপথের বৈচিত্র্য:
সূর্যকিরণে হিমালয়ের তুষার ধবল হিমশৃঙ্গ গলে গলে আমার প্রাণধারার সৃষ্টি। গলিত হিমবাহের বিভিন্ন ঝরণা ধারা ক্রমে মিলিত হয়ে আমার মধ্যে এক উত্তাল বেগের সঞ্চার হল। সেই উদ্দাম জলধারা বুকে নিয়ে ঝাঁপিয়ে ঝাঁপিয়ে নামতে থাকি সমতলের উদ্দেশ্যে।
"আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে,
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।" – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাহাড়ের মাঝে এই আমার উত্তাল শক্তি সম্পন্ন জলধারাকে তোমরা ঊর্ধ্বগতি বলো। হরিদ্বারের সমতল ভূমিতে আমার অবতরণ ঘটল। সমতল ক্ষেত্রের স্বাভাবিক গতিকে তোমরা বলো মধ্যগতি। ক্রমে আমার উভয় তীরে গড়ে উঠল কানপুর, বারাণসী, এলাহাবাদ, পাটনা, মুঙ্গের, কলকাতার মত কত শত শহর-নগর-বন্দর।
সুখ-দুঃখের নিত্যসঙ্গী:
সেই থেকে তোমাদের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়ে আমি বয়ে চলেছি এই মর্ত্যভূমিতে। ঘোর বর্ষায় যখন আমি ফুলে ফেঁপে দু’কূল ভাসিয়ে দিই তখন ভেঙে পড়ে আমার দু’পারের কত বাড়িঘর, গাছপালা। আমার বুক দিয়ে ভেসে যায় কত গবাদি-বাছুর, মানুষের মৃতদেহ। সব হারানোর দুঃখে মানুষ সব হাহাকার করে। আমি তাদের কান্না শুনি, তাদের বুক চাপড়ানো দেখি। তখন আমি নিশ্চুপ-নিয়তি।
যখন কোনো মায়ের একমাত্র পুত্র আমার বুকে সাঁতার দিতে এসে ডুবে যায়— তখন সেই মায়ের বুক-ভাঙা কান্না আর আমাকে দেওয়া অভিশাপ সব মুখ গুঁজে মেনে নিই। আমার তীরেই তো কত শত শ্মশান—তার ইয়ত্তা নেই।
"যে নদী হারায়ে স্রোত চলিতে না পারে,
সহস্র শৈবাল দাম বাঁধে আসি তারে।" – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সেখানে কত মানুষের শেষ-কৃত্যের হাহাকার আমার নিত্য দর্শন। তেমনি আবার আমার বুকের উপর দিয়ে বয়ে যায় বিয়ের আনন্দ যাত্রা। যখন অপর কোনো বিলাস ভ্রমণ ঘটে তখন তাদের সেই আনন্দেও আমার হৃদয়ে দোলা লাগে।
বর্তমান দূষিত অবস্থা ও আক্ষেপ:
যাদের আমি দু’হাত ভরে ফসল দিলাম, সভ্যতার আলো দেখালাম, তারাই আজ আমাকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে। আধুনিকতার নামে নদীর বুকে গড়ে ওঠা কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য, প্লাস্টিক আর আবর্জনায় আমার শ্বাস আজ রুদ্ধ।
আমার যে জল একসময় স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ ছিল, তা আজ বিষাক্ত, কালচে হয়ে গেছে। দূষণের এই ভয়াবহ রূপ দেখে আমি আজ নিজেই নিজের অস্তিত্ব নিয়ে শঙ্কিত।
উপসংহার:
সমুদ্রের কাছাকাছি এসে আমার গতি যখন আরও মন্থর হয় তখন তাকে তোমরা নিম্নগতি বলো। আমার যাত্রাপথ এখন ফুরিয়ে এসেছে। এমনিভাবেই আমি শেষ পর্যন্ত সাগরের বুকে বিলীন হয়েছি। যাওয়ার আগে শুধু এটুকুই বলার — তোমরা আমাকে বাঁচতে দাও। আমার এই অবিরাম জলধারা বেঁচে থাকলে তবেই তো তোমাদের সভ্যতা টিকে থাকবে।
"বহু দেশ দেখিয়াছি বহু নদ-নদে, কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে?"
পরবর্তী আরো প্রবন্ধ রচনা:
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম Study গ্রুপে যুক্ত হোন -


