বাদল সরকার – প্রবন্ধ রচনা / জীবনী রচনা | আজ তোমাদের জন্য নিয়ে এলাম আধুনিক বাংলা নাট্যসাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ বাদল সরকার-এর উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ/জীবনী রচনা। বাংলা নাটককে যিনি মঞ্চের গণ্ডি ছাড়িয়ে সমাজ ও মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছেন, তিনি বাদল সরকার।
উচ্চমাধ্যমিক বাংলা পরীক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই যারা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছ, তাদের জন্য এই প্রবন্ধটি মনোযোগ দিয়ে পড়া এবং তৈরি করা সত্যিই দরকার।
প্রবন্ধ রচনা: গণনাট্যের দিশারী বাদল সরকার (জন্মশতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি)
“মঞ্চের মায়া ছেড়ে যিনি নামলেন রাজপথে, নাটক শোনালেন তিনি সাধারণ মানুষের সাথে।”
বাংলা নাটকের ইতিহাসে যে কয়েকজন নাট্যব্যক্তিত্ব মঞ্চের জৌলুস ত্যাগ করে নাটককে সাধারণ মানুষের খুব কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য হলেন বাদল সরকার। তিনি কেবল একজন নাট্যকার বা নির্দেশক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক যুগান্তকারী দর্শনের প্রবক্তা। তাঁর হাত ধরেই বাংলা নাটক ড্রয়িংরুম আর প্রসেনিয়াম মঞ্চ (থিয়েটার হল) থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছিল খোলা আকাশের নিচে, পার্কের বেঞ্চে কিংবা রাস্তার মোড়ে। আজ তাঁর জন্মশতবর্ষে দাঁড়িয়ে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো আমাদের কর্তব্য।
জন্ম ও বংশপরিচয়:
১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই জুলাই এই মহান নাট্যব্যক্তিত্বের জন্ম হয় কলকাতায়। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল সুধীন্দ্রনাথ সরকার, কিন্তু ডাকনাম ‘বাদল’-ই তাঁকে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর পিতার নাম ছিল মহেন্দ্রলাল সরকার। এক সংস্কৃতিমনস্ক ও শিক্ষিত পরিবারে বেড়ে ওঠার সুবাদে ছোটবেলা থেকেই তাঁর মনে শিল্প ও সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ জন্মেছিল।
শিক্ষাজীবন ও পেশা:
বাদল সরকারের শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত কৃতিময়। তিনি স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন এবং পরবর্তীকালে শিবপুর বি.ই. কলেজ থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন। কর্মজীবনে তিনি ছিলেন একজন দক্ষ প্রকৌশলী বা ইঞ্জিনিয়ার। তিনি টাউন প্লানার (নগর পরিকল্পনাবিদ) হিসেবে দীর্ঘকাল দেশ ও বিদেশে (বিশেষ করে ইংল্যান্ড ও আফ্রিকায়) কাজ করেছেন। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাঠখোট্টা জগত তাঁর শিল্পীমনকে আটকে রাখতে পারেনি।
নাট্যজীবন ও ‘শতাব্দী’ গঠন:
চাকরি জীবন থেকেই তাঁর নাট্যচর্চার শুরু। তবে তাঁর নাট্যজীবনের বাঁক বদল হয় ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে, যখন তিনি নিজের নাট্যগোষ্ঠী ‘শতাব্দী’ প্রতিষ্ঠা করেন। এর আগেই ১৯৬৩ সালে তিনি রচনা করেন তাঁর কালজয়ী নাটক ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’।
এই নাটকটি বাংলা থিয়েটারে এক নতুন যুগের সূচনা করে, যেখানে তিনি মধ্যবিত্ত সমাজের অস্তিত্বের সংকট, হতাশা ও যন্ত্রণাকে অদ্ভুত নিপুণতায় তুলে ধরেন। এরপর একে একে তিনি ‘বাকি ইতিহাস’, ‘পাগলা ঘোড়া’, ‘সাঁঝের সিরিয়াল’, ‘বহুদিন পরে’ প্রভৃতি নাটক উপহার দেন।
তৃতীয় ধারার নাটক (Third Theatre):
“থিয়েটার কোনো বিলাসিতা নয়, থিয়েটার বেঁচে থাকার, লড়াই করার হাতিয়ার। মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে মঞ্চ ভাঙতেই হবে।”
বাদল সরকারের জীবনের সবচেয়ে বড় অবদান হলো ‘থার্ড থিয়েটার’ বা ‘তৃতীয় ধারা’র নাটক প্রবর্তন। তিনি বিশ্বাস করতেন, নাটক করার জন্য দামী আলো, সেট বা মঞ্চের প্রয়োজন নেই। নাটক হতে হবে সস্তা, বহনযোগ্য এবং তা সরাসরি দর্শকের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলবে। তিনি ‘অঙ্গনমঞ্চ’-এর ধারণা নিয়ে আসেন, যেখানে অভিনেতা ও দর্শকের মধ্যে কোনো দূরত্ব থাকে না। তাঁর এই দর্শন সারা ভারতের নাট্যজগতে বিপ্লব এনেছিল।
"অমল, বিমল, কমল আর ইন্দ্রজিৎ—এরা কেবল চরিত্র নয়, এরা আমাদের ক্ষয়ে যাওয়া মধ্যবিত্ত সমাজের আয়না।"উল্লেখযোগ্য নাটক ও সাহিত্যকীর্তি:
বাদল সরকার প্রচুর নাটক রচনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁর নাটকগুলো মূলত সমাজসচেতন ও রাজনীতিমনস্ক। তোমাদের দেওয়া তথ্য ও অন্যান্য বিখ্যাত নাটকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
- মৌলিক ও বিখ্যাত নাটক: ‘মিছিলে’, ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’, ‘বাসি খবর’, ‘পাগলা ঘোড়া’।
- অন্যান্য নাটক: ‘ভোম্বল সর্দার’, ‘ভগত সিং’, ‘গাও’, ‘গিনিপিগ’, ‘জুলিয়াস সিজার’, ‘স্পার্টাকাস’ ইত্যাদি। তাঁর নাটকের সংলাপ আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি:
তাঁর অসামান্য প্রতিভার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
- ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে (মতান্তরে ১৯৬৭) তিনি ‘সংগীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার’ লাভ করেন।
- ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে ভারত সরকার তাঁকে সম্মানজনক ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত করে।
- পরবর্তীকালে তিনি সংগীত নাটক অ্যাকাডেমির সর্বোচ্চ সম্মান ‘ফেলোশিপ’ বা রত্ন সদস্যপদ লাভ করেন।
জীবনাবসান:
বাংলা নাটকের এই কিংবদন্তি পুরুষ ২০১১ খ্রিস্টাব্দের ১৩ই মে পরলোকগমন করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।
উপসংহার:
বাদল সরকার চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন তাঁর ‘মিছিল’। তিনি শিখিয়ে গেছেন যে নাটক কেবল বিনোদন নয়, নাটক হলো প্রতিবাদের ভাষা, সমাজ বদলের হাতিয়ার। আজ তাঁর জন্মশতবর্ষে দাঁড়িয়ে আমরা বলতে পারি,
“তিনি আজ নেই, কিন্তু যতদিন সমাজে শোষণ থাকবে, ততদিন বাদল সরকার এবং তাঁর নাটক আমাদের বিবেকের পাহারাদার হয়ে জেগে থাকবে।”
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম Study গ্রুপে যুক্ত হোন -



