প্রবন্ধ রচনা: তরুণের স্বপ্ন | আজকের তরুণ সমাজই আগামী দিনের দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের চিন্তা, কল্পনা, আশা ও স্বপ্নের ওপরই নির্ভর করে সমাজের অগ্রগতির দিশা। সেই কারণেই “তরুণের স্বপ্ন” বিষয়টি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা বাংলা প্রবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক।
[প্রবন্ধ রচনা] তরুণের স্বপ্ন – ভবিষ্যতের কান্ডারি
"ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ, আধ-মরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা। রক্ত আলোর মদে মাতাল ভোরে, আজকে যে যা বলে বলুক তোরে..." — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (সবুজ পত্র)
প্রাককথন: যৌবনের জয়গান
তারুণ্য কোনো বয়স নয়, তারুণ্য হলো মনের এক বিশেষ অবস্থা। এটি সেই শক্তি যা অসম্ভবকে সম্ভব করে, যা জরাজীর্ণ পুরাতনকে ভেঙে নতুনের কেতন ওড়ায়। প্রতিটি জাতির মেরুদণ্ড হলো তার যুবসমাজ, তরুণ এবং তরুণী। তরুণের চোখে যে স্বপ্ন ভাসে, তা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের স্বপ্ন নয়, তা হলো দেশ ও সমাজ গড়ার স্বপ্ন।
“হে আমার তরুণ জীবনের দল! এসো, আমরাও এই বাণী উচ্চারণ করে বেদির সম্মুখে উপস্থিত হই— ‘মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন’।”তারুণ্যের শক্তি ও তেজ: বিবেকানন্দের আহ্বান
আজকের তরুণরাই আগামী দিনের ইতিহাস রচয়িতা। তরুণরা হলো সূর্যের মতো তেজস্বী এবং ঝড়ের মতো গতিশীল। তাদের শিরায় শিরায় যে উষ্ণ রক্তস্রোত প্রবাহিত, তাতেই লুকিয়ে আছে আগামী দিনের সম্ভাবনা। স্বামী বিবেকানন্দের ভাষায়, তাদের হতে হবে— “লোহার মতো পেশি ও ইস্পাতের মতো স্নায়ু”-র অধিকারী।
নেতাজির দর্শন ও তরুণের আদর্শ
"তরুণের ধর্মই হলো আত্মত্যাগ। যে জাতি নিজেকে বিলিয়ে দিতে জানে না, সে জাতি কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না।" — (নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর তরুণের স্বপ্ন প্রবন্ধ থেকে )
নেতাজি বিশ্বাস করতেন, তরুণদের স্বপ্ন বিলাসিতার নয়, বরং তা আগুনের মতো পবিত্র। তাদের স্বপ্ন হবে পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনের, তাদের স্বপ্ন হবে বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার। আজকের প্রেক্ষাপটে সেই পরাধীনতা হলো—বেকারি, দুর্নীতি এবং কুসংস্কার।
বিদ্রোহ ও নতুনের কেতন: নজরুলের তারুণ্য
তারুণ্য মানেই প্রথা ভাঙার স্পর্ধা। তরুণদের স্বপ্ন স্থবির নয়, তা গতিশীল। তারা পুরনো জঞ্জাল সাফ করে নতুন সমাজ গড়বে। তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষ করবে না।
"মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্দাম, মোরা ঝর্ণার মত চঞ্চল, মোরা বিধাতার মত নির্ভয়, মোরা প্রকৃতির মত স্বচ্ছল।"
দেশ ও জাতি গঠনে ভূমিকা:
‘নূতন জাতি সৃষ্টির দায়িত্ব তরুণ সম্প্রদায়ের উপর ন্যস্ত’। ইতিহাস সাক্ষী, যুগে যুগে যত বিপ্লব, যত পরিবর্তন এসেছে, তার পুরোধা ছিল তরুণরা। পরাধীন ভারতে ক্ষুদিরাম, বিনয়-বাদল-দীনেশ বা ভগৎ সিং—এঁরা সবাই ছিলেন তরুণ। আজকের স্বাধীন ভারতেও ক্ষুধা, দারিদ্র্য, কুসংস্কার এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করার দায়িত্ব তরুণদেরই নিতে হবে। তাদের স্বপ্ন দেখতে হবে এক নতুন ভারতের, যেখানে ভেদাভেদ থাকবে না, যেখানে শিক্ষার আলো সবার ঘরে পৌঁছাবে।
আত্মনির্ভরতা ও সাধনা:
তরুণের স্বপ্ন কেবল অলস দিবাস্বপ্ন হলে চলবে না। তাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে চাই কঠোর সাধনা। অনুচ্ছেদে যেমন বলা হয়েছে, বাহ্যশক্তির ওপর নির্ভর না করে স্বাবলম্বী হতে হবে। আজকের তরুণদের কেবল চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হতে হবে, নতুন নতুন আবিষ্কারে মগ্ন হতে হবে। তাদের শিক্ষা ও চরিত্রকে এমনভাবে গঠন করতে হবে যাতে তারা বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। আত্মবিশ্বাসই হলো তাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
স্বপ্নভঙ্গ ও দিকভ্রান্তি: বর্তমান প্রেক্ষাপট
আজকের তরুণ সমাজ প্রযুক্তির গোলকধাঁধায় অনেক সময় পথ হারাচ্ছে। ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার গড়তে গিয়ে তারা ভুলে যাচ্ছে দেশমাতৃকার কথা। কিন্তু মেঘের আড়ালে যেমন সূর্য থাকে, তেমনই এই সাময়িক বিভ্রান্তি কেটে যাবে। কারণ তারুণ্যের ধর্মই হলো ছাই ভস্ম করে আবার জ্বলে ওঠা।
উপসংহার:
আজকের তরুণরাই আগামী দিনের কান্ডারি। তাই অবসাদ, হতাশা বা মাদকাসক্তির অন্ধকারে হারিয়ে গেলে চলবে না। তরুণদের মনে রাখতে হবে, তাদের জীবন কেবল নিজের সুখের জন্য নয়, দেশ ও দশের কল্যাণের জন্য। কবিগুরুর ভাষায়— “ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ, আধ-মরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।” এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে তরুণ সমাজ যদি জেগে ওঠে, তবে ভারতের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হতে বাধ্য।
"সময় নেই আর ঘুমিয়ে থাকার, তোলো নতুন ঢেউ,
তোরা জাগলে বদলাবে দেশ, রুখবে না আর কেউ।"
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম Study গ্রুপে যুক্ত হোন -



