প্রবন্ধ রচনা: ভারত এক মিলনমেলা – আজ তোমাদের জন্য নিয়ে এলাম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চিরপ্রাসঙ্গিক প্রবন্ধ— “ভারত এক মিলনমেলা”। ভারতের বহুত্ববাদ, সংস্কৃতির বৈচিত্র্য ও জাতীয় ঐক্যের ধারণা এই বিষয়টির মূল কেন্দ্রবিন্দু।
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এই প্রবন্ধটি বারবার ঘুরে ফিরে আসে। তাই যারা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছ, তাদের জন্য এই প্রবন্ধটি ভীষণ উপযোগী। বিষয়টি ভালোভাবে বুঝে নিলে যেমন নম্বর তোলা সহজ হবে, তেমনই ভারতের সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিও আরও পরিষ্কার হবে।
[প্রবন্ধ রচনা] মহামানবের সাগরতীরে: ভারত এক মিলনমেলা
(অথবা: নানা ভাষা নানা মত: ঐক্যের ভারত) তথ্যসূত্র বা মানস মানচিত্র অবলম্বনে প্রবন্ধ রচনা।
ভূমিকা:
"হে মোর চিত্ত, পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।" — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভারতবর্ষ কেবল একটি দেশ নয়, এটি একটি মহাদেশীয় চেতনা। হিমালয় থেকে কন্যাকুমারী—এই বিশাল ভূখণ্ডে যুগে যুগে কত জাতি, কত ধর্ম, কত বর্ণের মানুষ এসেছে, তার ইয়ত্তা নেই। কেউ এসেছে তরবারি হাতে, কেউ এসেছে শান্তির বাণী নিয়ে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, যারা এসেছে, তারা কেউ ফিরে যায়নি। ভারতের মাটিতেই তারা মিশে গেছে। তাই ভারত আজ এক বিশাল মিলনমেলা, এক মহামানবের সাগরতীর।
ইতিহাসের প্রেক্ষাপট ও আত্মীকরণ:
ভারতের ইতিহাস হলো গ্রহণের ইতিহাস, বর্জনের নয়। আর্য, অনার্য, দ্রাবিড়, চীন, শক, হুণ, পাঠান, মোগল—সবাই এক সময় এই পুণ্যভূমিতে প্রবেশ করেছে। সংঘাত হয়েছে, যুদ্ধ হয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবাই মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। কবিগুরুর ভাষায়:
"শক হূণ দল পাঠান মোগল এক দেহে হল লীন।"এই লীন হয়ে যাওয়াই ভারতের বিশেষত্ব। বিভিন্ন জাতির রক্তপ্রবাহ মিলেমিশে আজ তৈরি হয়েছে এক অখণ্ড ভারতীয় জাতিসত্তা। এখানে কেউ পর নয়, সবাই আপন।
ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য:
প্রকৃতি যেন নিজের হাতে ভারতকে বৈচিত্র্য দিয়ে সাজিয়েছে। উত্তরে যেমন তুষারশুভ্র হিমালয়, দক্ষিণে তেমনি বিশাল নীল সমুদ্র। পশ্চিমে থর মরুভূমি, আবার পূর্বে সজল-শ্যামল পাহাড়। প্রকৃতির এই বৈচিত্র্যের মতোই মানুষের জীবনেও রয়েছে অঢেল বৈচিত্র্য। কাশ্মীর থেকে কেরালা, গুজরাট থেকে আসাম—প্রতিটি রাজ্যের ভাষা আলাদা, পোশাক আলাদা, খাদ্যাভ্যাস আলাদা।
"নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান, বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান।" — অতুলপ্রসাদ সেনএখানে পাঞ্জাবের ভাংড়ার তালে পা মেলায় বাঙালি, আবার ইদের খুশিতে শামিল হয় দুর্গাপুজোর ঢাক। এই সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানই ভারতের প্রাণশক্তি।
ধর্মীয় সম্প্রীতি:
ভারতবর্ষ ধর্মনিরপেক্ষতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, শিখ, জৈন—সকল ধর্মের মানুষ এখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। মন্দিরের ঘণ্টার ধ্বনি আর মসজিদের আজান এখানে একই আকাশের নিচে মিশে যায়। নজরুল ইসলামের সেই অমিয় বাণী ভারতের আত্মায় গাঁথা:
"মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান। মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।।"
এখানে ধর্ম যার যার, কিন্তু উৎসব সবার। এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিই ভারতকে বিশ্বের দরবারে এক অনন্য আসনে বসিয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আমাদের কর্তব্য:
বর্তমানে মাঝে মাঝে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনায় আমাদের এই ঐক্যের সুর কেটে যাওয়ার উপক্রম হয়। ভেদাভেদ ও অসহিষ্ণুতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে চায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ভারত কোনো দিন বিভেদকে প্রশ্রয় দেয়নি। আমাদের সংবিধানের মূল মন্ত্রই হলো—’বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য‘ (Unity in Diversity)। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমাদের শপথ নিতে হবে যে, কোনো অশুভ শক্তিকেই আমরা এই মিলনমেলায় ফাটল ধরাতে দেব না।
অবতরণিকা (উপসংহার):
ভারতবর্ষ এক বিশাল বটবৃক্ষ, যার ছায়ায় সকল জাতি ও ধর্ম আশ্রয় পেয়েছে। এই মিলনমেলাই আমাদের শক্তি, আমাদের গর্ব। বিভেদ ভুলে, সংকীর্ণতা ত্যাগ করে আমরা যেন গাইতে পারি সেই মহামিলনের গান। পরিশেষে বলা যায়:
"বিভেদ আছে, বিচ্ছেদ নেই—এই ভারতের রীতি,
মিলনমেলায় গেয়ে যাই মোরা, মানবতার গীতি।"
ভারতবর্ষ বেঁচে থাকুক তার এই অটুট ঐক্যে, ভালোবাসায় আর মৈত্রীর বন্ধনে।
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম Study গ্রুপে যুক্ত হোন -



