প্রবন্ধ রচনা: পরিবেশ ও বিপন্ন মানুষ আজ তোমাদের জন্য নিয়ে এলাম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী প্রবন্ধ রচনা—পরিবেশ ও বিপন্ন মানুষ। বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, বন ধ্বংস ও প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষের উপর।
প্রবন্ধ রচনা: পরিবেশ ও বিপন্ন মানুষ
সূচনা / ভূমিকা / প্রাককথন
"দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর, লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর... হে নবসভ্যতা! হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী!" — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (সভ্যতার প্রতি)
রবীন্দ্রনাথ যখন এ কথা লিখেছিলেন, তখন তিনি হয়তো ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছিলেন। মানুষ আজ সভ্যতার শিখরে পৌঁছেছে ঠিকই, কিন্তু নিজের পায়ের তলার মাটি—অর্থাৎ পরিবেশকে ধংস করে। অরণ্য আজ কংক্রিটের জঙ্গল, নদী আজ নর্দমা, আর বাতাস আজ বিষাক্ত বাষ্প। মানুষ ভাবছে সে প্রকৃতিকে জয় করেছে, কিন্তু আদতে সে নিজের কবর নিজেই খুঁড়ছে। আজ পরিবেশ বিপন্ন, আর সেই বিপন্ন পরিবেশের প্রথম শিকার স্বয়ং মানুষ।
মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক: ভাঙন ও বিচ্ছেদ
"Earth provides enough to satisfy every man's needs, but not every man's greed." (বঙ্গানুবাদ: "পৃথিবী মানুষের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট, কিন্তু মানুষের লোভ মেটানোর জন্য নয়।")
বিগত শতাব্দীর দুটি বিশ্বযুদ্ধে এবং সেইসঙ্গে শিল্পবিপ্লবের কল্যাণে মানবজীবনে নানা উন্নতি সত্ত্বেও স্বার্থের সংঘাত, লোভের অপরিমিত স্বভাব, ভ্রাতৃদ্বন্দ, অনেকের চোরাবালি, ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ পরিবেশের সমস্যাকে অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, তেমনই নষ্ট হয়েছে বাস্তুতন্ত্র ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য। ফলে বর্তমানে যে পরিবেশের পরিবর্তন দেখা দিয়েছে, তাতে পৃথিবীর মানুষ বিপন্নতায় আক্রান্ত।
উন্নয়ন বনাম পরিবেশ:
সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষ প্রকৃতির ওপর নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে চেয়েছে। নগরপত্তন ও শিল্পায়নের প্রয়োজনে মানুষ নির্বিচারে অরণ্য ধ্বংস করেছে। কলকারখানার ধোঁয়া, বিষাক্ত বর্জ্য, এবং যথেচ্ছ প্লাস্টিকের ব্যবহার পরিবেশের শ্বাসরোধ করে দিয়েছে। তথাকথিত ‘উন্নয়ন’-এর নেশায় মানুষ ভুলে গেছে যে, প্রকৃতি কেবল ভোগের বস্তু নয়, বরং আমাদের অস্তিত্বের আধার। ফলে ঋতুচক্রের পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি এবং ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আজ নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দারিদ্র্য ও পরিবেশের সম্পর্ক:
পরিবেশ সংকটের একটি বড় কারণ হলো সামাজিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য। সমাজের একশ্রেণির মানুষের অসীম লোভ এবং ভোগবিলাসিতার কারণে প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় হচ্ছে। অন্যদিকে, দারিদ্র্যের কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে প্রকৃতির ওপর অবিচার করছে। সম্পদকে কিছু মানুষের হাতে কুক্ষিগত করে রেখেছে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে দরিদ্র করে রেখেছে। দারিদ্র্য দূরীকরণ না হলে পরিবেশ রক্ষা করাও কঠিন হয়ে পড়বে।
উষ্ণায়নের দহন ও আসন্ন প্রলয়:
গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাবে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। মেরুপ্রদেশের বরফ গলছে, সমুদ্রের জলতল বাড়ছে। এর ফলে সৃষ্টি হচ্ছে ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’ (Climate Refugees)। সুন্দরবন থেকে শুরু করে মালদ্বীপ—মানুষ আজ ভিটেমাটি হারাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়, খরা, বন্যা আজ আর প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, এগুলো মানুষেরই তৈরি ‘মরণফাঁদ’।
বিপন্ন মানব অস্তিত্ব:
পরিবেশের এই ভারসাম্যহীনতা আজ মানবজাতিকে এক চরম সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ওজন স্তরের ক্ষয়ের ফলে চর্মরোগ ও ক্যানসারের মতো মারণরোগ বাড়ছে। বাতাসে অক্সিজেনের ঘাটতি এবং বিষাক্ত গ্যাসের বৃদ্ধি মানুষকে শ্বাসকষ্টের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আজ মানুষ বুঝতে পারছে, পরিবেশ বিপন্ন হওয়ার অর্থ হলো মানুষের নিজের অস্তিত্বই বিপন্ন হওয়া।
উত্তরণের পথ ও আমাদের দায়বদ্ধতা:
এই বিপন্নতা থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।
- ১. সচেতনতা বৃদ্ধি: কেবল আইন করে নয়, মানুষের মধ্যে পরিবেশচেতনা জাগিয়ে তুলতে হবে।
- ২. বনসৃজন: ‘একটি গাছ, একটি প্রাণ’—এই মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে প্রচুর পরিমাণে গাছ লাগাতে হবে এবং অরণ্য ধ্বংস রোধ করতে হবে।
- ৩. স্থিতিশীল উন্নয়ন: উন্নয়নের নামে পরিবেশ ধ্বংস করা চলবে না। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে।
- ৪. সাম্য প্রতিষ্ঠা: সম্পদের সুষম বণ্টন এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ করতে পারলে পরিবেশের ওপর চাপ কমবে।
উপসংহার: ধ্বংস নাকি সৃষ্টি?
মানুষ ও পরিবেশ একে অপরের পরিপূরক। পরিবেশ বাঁচলে তবেই মানুষ বাঁচবে। আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তাই আজ আমাদের শপথ নিতে হবে—লোভ সংবরণ করে, প্রকৃতির সঙ্গে মিতালি পাতিয়ে আমরা আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীকে রক্ষা করব। নতুবা মহাকালের ইতিহাসে মানুষ এক বিলুপ্ত প্রজাতি হিসেবে গণ্য হবে।
"প্রকৃতি যদি না বাঁচে, বাঁচবে না তো কেউ, ডুববে তরী সভ্যতা, যখন আসবে প্রলয়- ঢেউ।"
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম Study গ্রুপে যুক্ত হোন -



