কন্যাশ্রী প্রকল্প – প্রবন্ধ রচনা | আজ তোমাদের জন্য নিয়ে এলাম পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি যুগান্তকারী ও সমাজপরিবর্তনকারী উদ্যোগ— কন্যাশ্রী প্রকল্প–এর উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ রচনা। কন্যাশ্রী প্রকল্প শুধু একটি সরকারি প্রকল্প নয়, এটি কন্যাশিশুদের শিক্ষা, ক্ষমতায়ন ও মর্যাদার প্রতীক।
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই যারা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছ, তাদের জন্য এই প্রবন্ধটি মনোযোগ দিয়ে পড়া এবং সংগ্রহ করে রাখা বাস্তবিকই কাজে দেবে।
প্রবন্ধ রচনা: নারীশিক্ষার আলোকবর্তিকা – কন্যাশ্রী প্রকল্প
"নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার কেন নাহি দিবে অধিকার হে বিধাতা?" (চিত্রাঙ্গদা নাট্যকাব্য) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উক্তি (নারীর অধিকার প্রসঙ্গে)
একটি সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য নারী ও পুরুষ উভয়েরই সমান অবদান থাকা প্রয়োজন। নারীদের পিছিয়ে রেখে কোনো দেশ বা জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। পশ্চিমবঙ্গের নারীশিক্ষা ও নারী ক্ষমতায়নের ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ হলো পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রবর্তিত ‘কন্যাশ্রী প্রকল্প’।
‘প্রকল্পের রূপরেখা ও ঐতিহাসিক সূচনা’ : উদ্দেশ্য
২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে এই জনহিতকর প্রকল্পটির সূচনা হয়। এই প্রকল্পের বেশ কয়েকটি মহৎ উদ্দেশ্য রয়েছে।
- প্রথমত, সমাজের অভিশাপস্বরূপ কন্যাভ্রূণ হত্যা রোধ করা এবং বাল্যবিবাহ বন্ধ করা।
- দ্বিতীয়ত, অনেক কিশোরী অর্থের অভাবে বা পারিবারিক চাপে মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়; এই স্কুলছুট (Drop-out) প্রবণতা আটকানোই এই প্রকল্পের লক্ষ্য।
- তৃতীয়ত, মেয়েদের স্বাবলম্বী করে সমাজে তাদের যথাযোগ্য মর্যাদা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা দান করা।
লক্ষ্য ও অভিমুখ:
মূলত অষ্টম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠরতা ছাত্রীদের এই প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে। বয়ঃসন্ধিকালের এই সময়টি মেয়েদের শিক্ষার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই সময়ে যাতে তারা স্কুল ছেড়ে না দেয় এবং ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে যেতে পারে, সেটাই এই প্রকল্পের লক্ষ্য।
বৃত্তিলাভের শর্ত ও নিয়মাবলি:
কন্যাশ্রী প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার জন্য কিছু নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হয়:
- ছাত্রীর পরিবারের বাৎসরিক আয় ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা বা তার কম হতে হবে। তবে অনাথ বা প্রতিবন্ধী ছাত্রীদের ক্ষেত্রে আয়ের এই উর্ধ্বসীমা বা বাধ্যবাধকতা নেই।
- ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত ছাত্রীকে অবশ্যই অবিবাহিত থাকতে হবে।
- ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হলে এবং পড়াশোনা চালিয়ে গেলে, ছাত্রী এককালীন ২৫ হাজার টাকা অনুদান পাবে।
সরকারের ভূমিকা ও বাজেট:
এই বিশাল কর্মযজ্ঞটি সফল করতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার বদ্ধপরিকর। এই প্রকল্পের বাস্তবায়নের জন্য রাজ্য সরকার বছরে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা খরচ করে থাকে। এই বিপুল অর্থব্যয় প্রমাণ করে যে রাজ্য সরকার নারীশিক্ষার প্রসারে কতটা আন্তরিক।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: বিশ্বমঞ্চে কন্যাশ্রী অথবা, ‘কন্যাশ্রী’ এখন ‘বিশ্বশ্রী’
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘কন্যাশ্রী প্রকল্প’ আজ আঞ্চলিক গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে এক সফল ‘উন্নয়ন মডেল’ হিসেবে স্বীকৃত। ২০১৭ সালের ২৩শে জুন নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে রাষ্ট্রপুঞ্জের (UN) বিশেষ অনুষ্ঠানে ৬২টি দেশের ৫৫২টি প্রকল্পকে পেছনে ফেলে কন্যাশ্রী ‘United Nations Public Service Award’ (প্রথম স্থান) অর্জন করে।
এছাড়াও ইউনিসেফ (UNICEF) ও ডিফিড (DFID)-এর প্রশংসা এই প্রকল্পের গুণগত মানকে আন্তর্জাতিক সিলমোহর দিয়েছে। এই ঐতিহাসিক সাফল্য কেবল বাংলার নয়, সমগ্র ভারতবাসীর কাছে এক গর্বের মাইলফলক।
"শিক্ষার আলোয় ঘুচলো আঁধার, খুললো নতুন দ্বার, কন্যাশ্রী আজ বিশ্বমঞ্চে গর্ব বাংলার।"
উপসংহার:
‘কন্যাশ্রী’ কেবল একটি আর্থিক অনুদান নয়, বরং নারী-ক্ষমতায়নের এক নীরব বিপ্লব। এটি পিতৃতান্ত্রিক সমাজের বেড়া ভেঙে মেয়েদের ‘বোঝা’ থেকে ‘মানবসম্পদ’-এ উন্নীত করেছে। বিবেকানন্দের ভাষায়— “পাখির যেমন এক ডানায় ওড়া সম্ভব নয়, তেমনই নারীকে বাদ দিয়ে সমাজের উন্নতি অসম্ভব।”
কন্যাশ্রী বাংলার মেয়েদের সেই ‘দ্বিতীয় ডানা’টি মেলে ধরার সুযোগ করে দিয়েছে। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, এই প্রকল্পই ভবিষ্যতের এক বৈষম্যহীন ও প্রগতিশীল সমাজ গড়ার মূল ভিত্তি।
"শিকল ছিঁড়ে উড়ছে 'কন্যা', আকাশ ছোঁয়ার টানে,
কন্যাশ্রী আজ নতুন আলোর স্বপ্ন আঁকে প্রাণে।"
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম Study গ্রুপে যুক্ত হোন -



