নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু – জীবনী রচনা | ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের শ্রেষ্ঠতম অগ্নিপুরুষ নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু-এর উপর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রচনা। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক এবং বিভিন্ন পরীক্ষায় এই বিষয়টি বারবার আসে। অনেকে ২৩ শে জানুয়ারি নেতাজির জন্ম জয়ন্তী উপলক্ষে বক্তব্য হিসেবেও তথ্য দরকার হয়।
প্রিয় ছাত্র-ছাত্রী বন্ধুরা, আমরা আমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা দিয়ে নেতাজির ওপর এই লেখাটি তৈরি করেছি। এটি কোনো সাধারণ বইয়ের বা নোটবুকের গৎবাঁধা রচনা নয়। এখানে প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি উক্তি এবং লাইন এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যা তোমাদের প্রবন্ধ বা বক্তব্যকে ‘সেরা’ করে তুলবে।
প্রবন্ধ রচনা: দেশনায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু
"রক্ত দেব"—বজ্রকণ্ঠে ডাক দিলেন যিনি,
তাঁর কাছে এই ভারতবাসী জনমে জনমে ঋণী।সুভাষচন্দ্র বসু কেবল একটি নাম নয়, তিনি এক অবিনশ্বর চেতনা, পরাধীন ভারতের মুক্তি-সূর্য, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ধ্রুবতারা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে অদম্য সাহস, তেজস্বিতা এবং আপসহীন মানসিকতার প্রয়োজন ছিল, সুভাষচন্দ্র ছিলেন তাঁর মূর্ত প্রতীক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে যথার্থই ‘দেশনায়ক’ আখ্যা দিয়েছিলেন। ভিক্ষা করে যে স্বাধীনতা পাওয়া যায় না, স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়, তাঁর বিখ্যাত উক্তি— “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব।”
জন্ম ও বংশপরিচয়
১৮৯৭ সালের ২৩শে জানুয়ারি। পরাধীন ভারতের আকাশ তখন ঘোর অন্ধকারে আচ্ছন্ন, ঠিক সেই সময়েই ওড়িশার কটক শহরে জন্ম নিলেন এক কালপুরুষ, যিনি জানতেন—কীভাবে আঁধার চিরে ভোরের সূর্য ছিনিয়ে আনতে হয়। তাঁর পিতা জানকীনাথ বসু ছিলেন কটক শহরের একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ সরকারি আইনজীবী এবং মাতা ছিলেন বিদুষী ও ধর্মপরায়ণা নারী প্রভাবতী দেবী। ছোটবেলা থেকেই তাঁর চোখেমুখে ছিল এক অদ্ভুত দীপ্তি ও দৃঢ়তা।
প্রতিবাদের প্রথম পাঠ: ছাত্রজীবন
সুভাষচন্দ্রের শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল। কটকের প্রোটেস্ট্যান্ট ইউরোপিয়ান স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি র্যাভেনশ কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় ওড়িশা ও বিহারের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। এরপর তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। ছাত্রাবস্থাতেই তাঁর মধ্যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মানসিকতা তৈরি হয়েছিল।
প্রেসিডেন্সি কলেজে ভারতবিদ্বেষী ইংরেজ অধ্যাপক ওটেন সাহেব ভারতীয় ছাত্রদের অপমান করলে সুভাষচন্দ্র তার তীব্র প্রতিবাদ করেন। এর ফলে তাঁকে কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হতে হয়। পরবর্তীকালে তিনি আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সহায়তায় স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হন এবং দর্শনে অনার্স-সহ বি.এ. পাশ করেন।
দাসত্বে পদাঘাত: আই.সি.এস প্রত্যাখ্যান ও দেশসেবায় আত্মনিয়োগ
১৯১৯ সালে তিনি বিলেতে যান এবং অত্যন্ত কঠিন আই.সি.এস (I.C.S) পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান অধিকার করেন। কিন্তু পরাধীন দেশের হয়ে ব্রিটিশ সরকারের গোলামি করা তাঁর স্বভিমান ও দেশপ্রেমের বিরোধী ছিল। স্বামী বিবেকানন্দের ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত সুভাষচন্দ্র বিলেত থেকেই সেই লোভনীয় পদ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বুঝেছিলেন, দেশের সেবা করতে হলে ত্যাগের মন্ত্রে দীক্ষিত হতে হবে। ১৯২১ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং নিজেকে সম্পূর্ণভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামে উৎসর্গ করেন।
‘দেশনায়ক’ : রাজনৈতিক জীবন ও নেতৃত্ব
দেশে ফিরে তিনি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসকে নিজের রাজনৈতিক গুরু হিসেবে বরণ করেন। ১৯২১ সালে প্রিন্স অফ ওয়েলস-এর ভারত আগমনের প্রতিবাদে কলকাতায় যে হরতাল পালিত হয়, তাতে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সুভাষচন্দ্র কারাবরণ করেন। দেশবন্ধুর মৃত্যুর পর তিনি বাংলার রাজনীতির প্রধান কান্ডারি হয়ে ওঠেন।
তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ও জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে বারবার কারারুদ্ধ করে। ১৯৩৮ সালে হরিপুরা কংগ্রেসে এবং ১৯৩৯ সালে ত্রিপুরী কংগ্রেসে তিনি পরপর দুবার জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে মতাদর্শগত পার্থক্যের কারণে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করেন এবং ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ নামে এক নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন।
রণহুংকার: মহানিষ্ক্রমণ ও আজাদ হিন্দ ফৌজ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ব্রিটিশ সরকার সুভাষচন্দ্রকে তাঁর এলগিন রোডের বাড়িতে গৃহবন্দি করে রাখে। কিন্তু সিংহের তেজের কাছে শিকল টিকবে কি করে। ১৯৪১ সালের ১৭ই জানুয়ারি গভীর রাতে পুলিশ ও গোয়েন্দাদের চোখে ধুলো দিয়ে ‘মহম্মদ জিয়াউদ্দিন’-এর ছদ্মবেশে তিনি ভারত ত্যাগ করেন যা ‘মহানিষ্ক্রমণ’ (The Great Escape) নামে পরিচিত।
কাবুল ও রাশিয়া হয়ে তিনি জার্মানি পৌঁছান। এরপর সাবমেরিনে করে তিনি জাপানে যান এবং রাসবিহারী বসুর ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’-এর সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সিঙ্গাপুরে তিনি গঠন করেন ‘আর্জি হুকুমৎ-এ-আজাদ হিন্দ’ বা আজাদ হিন্দ সরকার। তিনি ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ-এর নামানুসারে নারীবাহিনী ‘ঝাঁসি রেজিমেন্ট’ও গঠন করেন।
দিল্লি চলো: দেশমুক্তির চূড়ান্ত সংগ্রাম
নেতাজির নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ বাহিনী প্রবল পরাক্রমে ব্রিটিশ ও আমেরিকান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। তাঁর রণধ্বনি “দিল্লি চলো” এবং “জয় হিন্দ” ভারতীয় সেনাদের মধ্যে এক অলৌকিক শক্তির সঞ্চার করেছিল। ১৯৪৪ সালের ১৯শে মার্চ আজাদ হিন্দ বাহিনী ভারতের মাটিতে পা রাখে এবং মণিপুরের মৈরাঙে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে। কোহিমা ও ইম্ফলের যুদ্ধে আজাদ হিন্দ ফৌজের বীরত্ব ব্রিটিশদের বুঝিয়ে দিয়েছিল যে তাদের দিন শেষ হয়ে এসেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, প্রবল বর্ষা, রসদ ও খাদ্যের অভাব এবং জাপানের আত্মসমর্পণের ফলে আজাদ হিন্দ বাহিনীকে পিছু হটতে হয়।
মৃত্যুঞ্জয়ী বীর: বিমান দুর্ঘটনা নাকি অনন্ত যাত্রা?
১৯৪৫ সালের ১৮ই আগস্ট এক বিমান দুর্ঘটনায় তাইহোকু বিমানবন্দরে নেতাজির মৃত্যু হয়েছে বলে জাপানি রেডিওতে প্রচার করা হয়। কিন্তু এই খবর আজও রহস্যে আবৃত। মুখার্জি কমিশন-সহ বহু তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও তাঁর মৃত্যুর সঠিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আপামর ভারতবাসীর বিশ্বাস, মৃত্যুঞ্জয়ী বীরের মৃত্যু হতে পারে না, তিনি আজও জীবিত আছেন মানুষের বিশ্বাসে ও চেতনায়।
অমরত্বের শপথ: উপসংহার
"One individual may die for an idea, but that idea will, after his death, incarnate itself in a thousand lives."আজ নেতাজি আমাদের মাঝে সশরীরে নেই কিংবা রয়েছেন অন্তর্ধানে, কিন্তু তাঁর সেই আদর্শ, সেই আগুন আজও আমাদের ধমনীতে প্রবাহিত। সুভাষচন্দ্র বসু কেবল একটি নাম নয়, তিনি একটি ইতিহাস, একটি বিপ্লব। যদিও তিনি সশরীরে স্বাধীন ভারত দেখে যেতে পারেননি, কিংবা অন্তরালে দেখেছেন! কোটি কোটি ভারতবাসীর হৃদয়ে তিনি আজও ‘নেতাজি’ হয়েই বেঁচে আছেন। তাঁর উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করে বলা যায়—
“স্বাধীন ভারতে তোমাকে না পেয়ে করি আপশোষ,
এসো ফিরে তুমি, চির উন্নত শির নেতাজি সুভাষ বোস।”তোমরা স্কুলের পরীক্ষায়, প্রতিযোগিতায় ও ২৩শে জানুয়ারির মঞ্চে নির্দ্বিধায় এই কন্টেন্ট ব্যবহার করো। আমরা কথা দিচ্ছি, এই ‘আগুন ঝরা’ শব্দগুলো শ্রোতাদের গায়ে কাঁটা দেবেই। তোমার বন্ধুদের সাথে অবশ্যই শেয়ার করো, জয় হিন্দ!
পরবর্তী দেখবে: স্বামী বিবেকানন্দ বাংলা প্রবন্ধ রচনা (বীরেশ্বর বিবেকানন্দ)
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম Study গ্রুপে যুক্ত হোন -



