বিংশ শতাব্দীর বিপ্লবী কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘ভাঙার গান’ কবিতাটি নবম শ্রেণির পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। পরাধীন ভারতবর্ষের বিপ্লবী যুবসমাজকে জাগিয়ে তুলতে এই কবিতাটি এক অমোঘ মন্ত্রের মতো কাজ করেছিল। ব্রিটিশ শক্তির অন্যায় কারাগার ভেঙে মুক্ত স্বাধীন ভারত গড়ার ডাক দিয়েছেন কবি।
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| পাঠের নাম | ভাঙার গান |
| কবি | কাজী নজরুল ইসলাম |
| কাব্যগ্রন্থ | ভাঙার গান (১৯২৪) |
| মূল সুর | বিদ্রোহ ও স্বদেশিকতা |
ভাঙার গান – কাজী নজরুল ইসলাম (নবম শ্রেণী বাংলা কবিতা)
আজকের এই পোস্টে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘ভাঙার গান’ কবিতাটির কাব্যতত্ত্ব, সারসংক্ষেপ, নামকরণের সার্থকতা এবং পরীক্ষায় আসার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তর খুব সহজ ভাষায় আলোচনা করা হয়েছে।
ভাঙার গান – কবি পরিচিতি
বাংলা সাহিত্যের ‘বিদ্রোহী কবি’ কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬)। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক ও সংগীতজ্ঞ। পরাধীন ভারতের শৃঙ্খল মোচনে তাঁর লেখনী আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলে উঠেছিল। অন্যায়, অবিচার ও শোষণের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন চির আপসহীন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে ‘অগ্নি-বীণা’, ‘বিষের বাঁশি’, ‘ভাঙার গান’, ‘প্রলয়শিখা’ ইত্যাদি। তাঁর কবিতা ও গান কেবল শিল্প নয়, বরং স্বাধীনতার যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তিনি হিন্দু-মুসলিম মিলনের এক উজ্জ্বল প্রতীক ছিলেন।
ভাঙার গান কবিতার সারাংশ (Summary)
‘ভাঙার গান’ কবিতার মূল প্রতিপাদ্য হলো পরাধীনতার বন্ধন ছিন্ন করা। কবি পরাধীন ভারতের তরুণ প্রজন্মকে আহ্বান জানিয়েছেন শোষকের লোহার তৈরি জেলখানার আগল ভেঙে ফেলতে। ব্রিটিশ শক্তি এদেশের বিপ্লবীদের লোহার শিকলে বেঁধে যে ‘পাাষাণ-বেদী’ বা শোষণের ভিত্তি তৈরি করেছে, তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করতে হবে।
কবি তরুণদের মহাদেবের মতো ধ্বংসের বাঁশি বাজাতে বলেছেন। প্রলয়কাল এলে যেমন পুরাতন ধ্বংস হয়ে নতুনের সৃষ্টি হয়, তেমনি ভারতের তরুণরাও যেন ধ্বংসের নিশান উড়িয়ে পরাধীনতার প্রাচীর ভেঙে দেয়। নজরুল তীব্র বিদ্রূপের সাথে প্রশ্ন করেছেন— এই তুচ্ছ শোষক রাজা কি করে মুক্ত স্বাধীন সত্যকে সাজা দেওয়ার সাহস পায়? ভগবান বা সত্য কখনও ফাঁসির দড়িতে স্তব্ধ হয় না, এই অমোঘ সত্যই তিনি বিপ্লবীদের হৃদয়ে গেঁথে দিতে চেয়েছেন। কবির মতে, লাথি মেরে পরাধীনতার তালা ভাঙা এবং বন্দিশালায় আগুন জ্বালিয়ে তাকে উপড়ে ফেলাই হলো আসল বীরত্ব। শৃঙ্খল ভাঙার এই গানই হলো মুক্তির পরম পথ।
ভাঙার গান কবিতার নামকরণের সার্থকতা
সাহিত্যে নামকরণ একটি শিল্পসম্মত দিক, যা রচনার মূল ভাববস্তুকে প্রকাশ করে। নজরুল ইসলামের ‘ভাঙার গান’ কবিতাটি এর ব্যতিক্রম নয়।
এক্ষেত্রে ‘ভাঙা’ শব্দটি নেতিবাচক নয়, বরং তা ইতিবাচক নবসৃষ্টির প্রতীক। পরাধীন ভারতের লোহা-কপাট, শিকল এবং কারাগারের যে তালা—তা আসলে পরাধীনতার প্রতীক। কবি বিশ্বাস করতেন, এই পুরোনো ও অন্যায্য কাঠামোটি না ভাঙলে স্বাধীনতার সূর্য উদিত হবে না। তাই তিনি ‘পাগলা ভোলা’ বা প্রলয়ঙ্করী শক্তির আরাধনা করেছেন, যার কাজই হলো জীর্ণকে ভেঙে ফেলা। এই ভাঙা কেবল ধ্বংস নয়, বরং অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ। কবির গানে কেবল রণধ্বনি নয়, আছে শৃঙ্খল মুক্তির উল্লাস। তাই পরাধীনতার প্রাচীর ও কারাগার ভেঙে ফেলার এই উদ্দীপনামূলক আহ্বানকে কেন্দ্র করেই ‘ভাঙার গান’ নামকরণটি সর্বতোভাবে সার্থক ও যুক্তিযুক্ত হয়েছে।
ভাঙার গান কবিতার বিশেষ শব্দার্থ
| শব্দ | অর্থ |
|---|---|
| লৌহ-কপাট | লোহার তৈরি দরজা |
| লোপাট | ধ্বংস বা নিশ্চিহ্ন করা |
| পাষাণ-বেদী | পাথরের তৈরি বেদী (এখানে কঠোর শৃঙ্খল) |
| তরুণ ঈশান | রুদ্ররূপী তরুণ প্রজন্ম (শিবের এক নাম ঈশান) |
| ধ্বংস-নিশান | বিনাশের পতাকা |
| গাজন | শিবকে তুষ্ট করার জন্য উৎসব ও বাদ্য |
| হৈদরী হাঁক | বীরত্বের গর্জন (হজরত আলির বীরত্বব্যঞ্জক ডাক) |
| দন্দুভি | এক ধরনের প্রাচীন রণবাদ্য |
| কাল-বৈশাখী | বিনাশকারী ঝোড়ো বাতাস |
| ভিত-নাড়ি | ভিত বা মূল স্তম্ভ |
| হীন তথ্য | নীচ বা ভুল বার্তা |
| Details | Link |
|---|---|
| নবম শ্রেণী ও পরবর্তী মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি WhatsApp গ্রুপ |
ভাঙার গান পাঠ্যাংশের প্রশ্ন উত্তর (MCQ) | Class 9 Bhangar Gan MCQ Question Answer
১. ‘ভাঙার গান’ কবিতার কবি কে?
(ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(খ) কাজী নজরুল ইসলাম
(গ) সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
(ঘ) জীবনানন্দ দাশ
উত্তর: (খ) কাজী নজরুল ইসলাম
২. কবি কোন কপাট ভেঙে লোপাট করতে বলেছেন?
(ক) কাঠের কপাট
(খ) স্বর্ণ কপাট
(গ) লৌহ-কপাট
(ঘ) কাচের কপাট
উত্তর: (গ) লৌহ-কপাট
৩. শিকল-পজোর পাাষাণ বেদীটি কীসে জমাট বেঁধেছে?
(ক) জলে
(খ) কালিতে
(গ) রক্ত-জমাট
(ঘ) বরফে
উত্তর: (গ) রক্ত-জমাট
৪. কবি কাকে বাঁশি বা বিষাণ বাজাতে বলেছেন?
(ক) পাগল ভোলাকে
(খ) তরুণ ঈশানকে
(গ) কাল-বোশেখিকে
(ঘ) ভগবানে
উত্তর: (খ) তরুণ ঈশানকে
৫. ঈশানকে কোন বিষাণ বাজাতে বলা হয়েছে?
(ক) প্রেমের বিষাণ
(খ) শান্তির বিষাণ
(গ) প্রলয়-বিষাণ
(ঘ) যুদ্ধের বিষাণ
উত্তর: (গ) প্রলয়-বিষাণ
৬. “উড়ুক প্রাচী’র প্রাচীর ভেদি”— এখানে প্রাচী বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
(ক) পশ্চিম
(খ) উত্তর
(গ) পূর্ব দিক
(ঘ) দক্ষিণ
উত্তর: (গ) পূর্ব দিক
৭. কবি কিসের বাজনা বাজানোর কথা বলেছেন?
(ক) বিয়ের বাজনা
(খ) গাজনের বাজনা
(গ) ছুটির বাজনা
(ঘ) উৎসবের বাজনা
উত্তর: (খ) গাজনের বাজনা
৮. “কে দেয় সাজা?” – কাকে সাজা দেওয়ার স্পর্ধা দেখানো হয়েছে?
(ক) অপরাধীকে
(খ) ভক্তকে
(গ) মুক্ত স্বাধীন সত্যকে
(ঘ) রাজাকে
উত্তর: (গ) মুক্ত স্বাধীন সত্যকে
৯. ভগবান ফাঁসি পরবে এ তথ্যকে কবি কী বলেছেন?
(ক) মহান তথ্য
(খ) হীন তথ্য
(গ) শ্রেষ্ঠ তথ্য
(ঘ) চিরন্তন তথ্য
উত্তর: (খ) হীন তথ্য
১০. কবি কাকে পাগলা ভোলা বলে সম্বোধন করেছেন?
(ক) রাজাকে
(খ) বন্দিদের
(গ) বিপ্লবীদের (শিবের রূপকে)
(ঘ) নিজেকে
উত্তর: (গ) বিপ্লবীদের
১১. পাগলা ভোলা গারদগুলোকে কীভাবে টানতে বলছেন?
(ক) আলতো করে
(খ) দড়ি দিয়ে
(গ) জোরসে-ধরে হেঁচকা টানে
(ঘ) চাকা দিয়ে
উত্তর: (গ) জোরসে-ধরে হেঁচকা টানে
১২. “হৈদরী হাঁক” কিসের প্রতীক?
(ক) কান্নার
(খ) ভয়ের
(গ) অদম্য বীরত্বের
(ঘ) বিষাদের
উত্তর: (গ) অদম্য বীরত্বের
১৩. কবি কাঁধে কী তুলে নেওয়ার কথা বলেছেন?
(ক) অস্ত্র
(খ) দন্দুভি ঢাক
(গ) তলোয়ার
(ঘ) বর্শা
উত্তর: (খ) দন্দুভি ঢাক
১৪. কবি মৃত্যুকে কোথায় ডাকার কথা বলেছেন?
(ক) মরণ পানে
(খ) জীবন পানে
(গ) বন পানে
(ঘ) আকাশ পানে
উত্তর: (খ) জীবন পানে
১৫. কারা নাচছে বলে কবি উল্লেখ করেছেন?
(ক) প্রজারা
(খ) সৈনিকরা
(গ) কাল-বোশেখি
(ঘ) তারকারা
উত্তর: (গ) কাল-বোশেখি
১৬. ভাঙার গান কবিতায় কোন কারার ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে?
(ক) জীর্ণ কারার
(খ) ক্ষুদ্র কারার
(গ) ভীম কারার
(ঘ) মায়াবী কারার
উত্তর: (গ) ভীম কারার
১৭. কবি কী ভেঙে ফেলতে লাথি মারতে বলেছেন?
(ক) দেয়াল
(খ) কপাট
(গ) তালা
(ঘ) পিঞ্জর
উত্তর: (গ) তালা
১৮. কবি বন্দিশালায় কী জ্বালানোর নির্দেশ দিয়েছেন?
(ক) প্রদীপ
(খ) ধূপ
(গ) আগুন
(ঘ) মশাল
উত্তর: (গ) আগুন
১৯. আগুন জ্বালিয়ে কিসের ভিত উপড়ে ফেলতে বলা হয়েছে?
(ক) বন্দিশালার
(খ) মন্দিরের
(গ) রাজপ্রাসাদের
(ঘ) সিংহাসনের
উত্তর: (ক) বন্দিশালার
২০. “গাজনের বাজনা বাজা!” – গাজন উৎসব কার সঙ্গে সম্পর্কিত?
(ক) বিষ্ণু
(খ) দুর্গা
(গ) শিব
(ঘ) কার্তিক
উত্তর: (গ) শিব
২১. কবি ব্রিটিশদের কী বলে বিদ্রূপ করেছেন?
(ক) বন্ধু
(খ) আত্মীয়
(গ) তুচ্ছ মালিক ও রাজা
(ঘ) দেবতা
উত্তর: (গ) তুচ্ছ মালিক ও রাজা
২২. “হা হা হা পায় যে হাসি”— কেন হাসছেন কবি?
(ক) আনন্দ পেয়ে
(খ) ভগবান ফাঁসি পরবে এই হীন তথ্যে
(গ) গান গেয়ে
(ঘ) খেলা দেখে
উত্তর: (খ) ভগবান ফাঁসি পরবে এই হীন তথ্যে
২৩. এই কবিতাটি কোন ছন্দে রচিত বলে মনে হয়?
(ক) ধীর লয়ের
(খ) বিষাদগ্রস্ত
(গ) উদ্দাম ও বীরত্বব্যঞ্জক
(ঘ) করুণ
উত্তর: (গ) উদ্দাম ও বীরত্বব্যঞ্জক
২৪. “শিকল-পূজোর পাাষাণ-বেদী!”— এখানে শিকল পুজোর অর্থ কী?
(ক) শিকল দিয়ে দেবতা পুজো
(খ) পরাধীনতাকে মান্যতা দেওয়া
(গ) বিপ্লবীদের পায়ে শিকল পরানো
(ঘ) শিকল পরিষ্কার করা
উত্তর: (গ) বিপ্লবীদের পায়ে শিকল পরানো
২৫. ভাঙার গান কবিতাটির মূল ভাবধারা কোনটি?
(ক) আপস করা
(খ) ব্রিটিশদের তোয়াজ করা
(গ) দাসত্ব মোচন ও বিপ্লব
(ঘ) প্রকৃতিপ্রেম
উত্তর: (গ) দাসত্ব মোচন ও বিপ্লব
২৬. নতুনের জয়গানে কবি কাকে ডাক দিয়েছেন?
(ক) শিশুদের
(খ) বৃদ্ধদের
(গ) ধ্বংসের দেবতা ও যুবশক্তিকে
(ঘ) ইংরেজদের
উত্তর: (গ) ধ্বংসের দেবতা ও যুবশক্তিকে
২৭. “হৈদরী হাঁক” কোন মহাপুরুষের সাথে যুক্ত?
(ক) শ্রীরামকৃষ্ণ
(খ) চৈতন্যদেব
(গ) হজরত আলি
(ঘ) অশোক
উত্তর: (গ) হজরত আলি
২৮. নজরুল ইসলামকে বিদ্রোহী কবি বলা হয় কেন?
(ক) তিনি যুদ্ধ করতেন
(খ) তাঁর লেখনী শোষণের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল
(গ) তিনি ঘরে থাকতেন না
(ঘ) তিনি রাজা ছিলেন
উত্তর: (খ) তাঁর লেখনী শোষণের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল
২৯. “দে রে দে প্রলয়-দোলা”— এই প্রলয় দোলার কাজ কী?
(ক) ঘুম পাড়ানো
(খ) শান্তি প্রতিষ্ঠা
(গ) পুরাতনকে ধ্বংস করে মুক্তি ঘটানো
(ঘ) গান শোনানো
উত্তর: (গ) পুরাতনকে ধ্বংস করে মুক্তি ঘটানো
৩০. ধ্বংসের নিশান ওড়ানোর মাধ্যমে কবি কীসের ইঙ্গিত দিয়েছেন?
(ক) পরাজয়ের
(খ) বিপ্লবের মাধ্যমে স্বাধীনতার
(গ) শোকের
(ঘ) ভয়ের
উত্তর: (খ) বিপ্লবের মাধ্যমে স্বাধীনতার
| Details | Link |
|---|---|
| নবম শ্রেণী ও পরবর্তী মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি WhatsApp গ্রুপ |
নবম শ্রেণী বাংলা ভাঙার গান কবিতার অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর | Class 9 Bhangar Gan Short Question Answer SAQ
১. কবি ‘ ভাঙার গান’ কবিতায় লোহার কপাটগুলো কী করতে বলেছেন?
উত্তর: কবি লোহার কপাটগুলো ভেঙে লোপাট বা নিশ্চিহ্ন করতে বলেছেন।
২. বিপ্লবীদের রক্ত দিয়ে কী জমাট বেঁধেছে?
উত্তর: বিপ্লবীদের রক্ত দিয়ে শিকল-পূজোর পাষাণ-বেদী জমাট বেঁধেছে।
৩. কবি ‘তরুণ ঈশান’কে কী বাজাতে বলেছেন?
উত্তর: তরুণ ঈশানকে প্রলয়-বিষাণ এবং গাজনের বাজনা বাজাতে বলেছেন।
৪. “পাাষাণ-বেদী” বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: পরাধীন ভারতবর্ষের কারাগারে বিপ্লবীদের ওপর চালিত অমানুষিক নির্যাতন ও দাসত্বের ভিত্তিকে পাষাণ-বেদী বলা হয়েছে।
৫. “মুক্ত স্বাধীন সত্যকে রে” কে সাজা দেয়?
উত্তর: অত্যাচারী শোষক তথা ব্রিটিশ শাসক তুচ্ছ রাজা সেজে সত্যকে সাজা দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে।
৬. ভগবান ফাঁসি পরবে— এই তথ্যকে কবি কী বলে অভিহিত করেছেন?
উত্তর: কবি একে ‘হীন তথ্য’ বা নীচ মিথ্যা তথ্য বলে অভিহিত করেছেন।
৭. “পাগলা ভোলা” সম্বোধনের অর্থ কী?
উত্তর: ধ্বংসের দেবতা শিবের মতো প্রলয়ঙ্করী ও নির্ভীক বিপ্লবী যুবশক্তিকে পাগলা ভোলা বলা হয়েছে।
৮. গারদগুলোকে কীভাবে টানার কথা বলা হয়েছে?
উত্তর: গারদগুলোকে জোরে হেঁচকা টানে ধরে উপরে ফেলার কথা বলা হয়েছে।
৯. “হৈদরী হাঁক” শব্দের আক্ষরিক অর্থ লেখো।
উত্তর: হজরত আলির মতো বীরত্বব্যঞ্জক সিংহগর্জন বা বীরের ডাক।
১০. কবি মৃত্যুকে কোথায় ডাকার পরামর্শ দিয়েছেন?
উত্তর: কবি মৃত্যুকে জীবনের অভিমুখে বা ‘জীবন পানে’ ডাকার কথা বলেছেন।
১১. ভীম কারার ভিত কীভাবে নাড়ানো সম্ভব?
উত্তর: বিপ্লবীদের প্রবল আক্রমণের হেঁচকা টানে ভীম কারার ভীতি নাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।
১২. বন্দিশালায় আগুন জ্বালানোর তাৎপর্য কী?
উত্তর: বন্দিশালা বা পরাধীনতার গ্লানিকে সমূলে বিনাশ করার জন্য বিদ্রোহের আগুন জ্বালানোর কথা বলা হয়েছে।
১৩. কবি লাথি মেরে কী ভাঙতে বলেছেন?
উত্তর: পরাধীনতার শৃঙ্খল তথা কারাগারের তালা লাথি মেরে ভাঙতে বলেছেন।
১৪. “ বাজাও ধ্বংস-নিশান”— ধ্বংস নিশান কিসের প্রতীক?
উত্তর: পরাধীনতার সমাপ্তি ও নতুনের জাগরণের প্রতীক।
১৫. “গাজনের বাজনা বাজা!”— এই বাজনা বিপ্লবীদের মনে কী সঞ্চার করে?
উত্তর: এই বাজনা বিপ্লবীদের মনে বিদ্রোহের তেজ ও প্রবল উদ্দীপনা সঞ্চার করে।
| Details | Link |
|---|---|
| নবম শ্রেণী ও পরবর্তী মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি WhatsApp গ্রুপ |
ভাঙার গান কবিতার ২ নম্বরের প্রশ্ন উত্তর | Class 9 Bhangar Gan 2 Marks Question Answer
১. “কারার ওই লৌহ-কপাট / ভেঙে ফেল, কররে লোপাট”— বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: অত্যাচারী ব্রিটিশ সরকার বিপ্লবীদের দমিয়ে রাখতে যে লৌহ-কপাটযুক্ত কারাগার তৈরি করেছে, কবি তাকে চূর্ণ করার ডাক দিয়েছেন। তিনি চান পরাধীনতার সমস্ত আগল লুপ্ত হয়ে যাক।
২. “শিকল-পূজোর পাাষাণ-বেদী!”— এই পংক্তিটির তাৎপর্য কী?
উত্তর: ব্রিটিশরা ভারতবাসীকে শিকল পরানোটাকেই নিয়ম বা প্রথা বানিয়ে তুলেছিল। বিপ্লবীদের রক্তে রঞ্জিত সেই শৃঙ্খল ও কারাগারের কঠোর ভিত্তিকে কবি এখানে পাষাণ-বেদী বলেছেন।
৩. কবি তরুণ প্রজন্মকে ‘ঈশান’ ও ‘পাগলা ভোলা’ বলেছেন কেন?
উত্তর: দেবাদিদেব মহাদেব যেমন ধ্বংসের মাধ্যমে পৃথিবীর জঞ্জাল সাফ করেন, তেমনি কবি চান পরাধীনতার আবর্জনা ধুয়ে ফেলতে বিপ্লবী যুবসমাজ শিবের মতো রুদ্র রূপ ধারণ করুক।
৪. “কে দেয় সাজা?”— কবি কার ক্ষমতার ওপর প্রশ্ন তুলেছেন?
উত্তর: সত্য চিরকাল মুক্ত ও স্বাধীন। সেই শাশ্বত সত্যের প্রতীক বিপ্লবীদের যখন ব্রিটিশরা সাজা দেয়, তখন কবি বিদ্রূপ করে তাদের ক্ষমতার অসারতা প্রকাশ করেন।
৫. “ভগবান পরবে ফাঁসি?”— এই তথ্যের মাধ্যমে কবির কোন মানসিকতা প্রকাশিত?
উত্তর: বিপ্লবীদের অন্তরে ভগবান বা সত্য বিরাজ করে। ব্রিটিশরা তাদের ফাঁসি দেওয়ার অর্থ হলো ভগবানকে ফাঁসি দেওয়া, যা অসম্ভব। তাই উদ্ধত শাসকদের অহংকারকে কবি হাসির খোরাক বানিয়েছেন।
৬. “দে রে দে প্রলয়-দোলা”— প্রলয় দোলার প্রয়োজনীয়তা কী?
উত্তর: পরাধীন দেশে যখন স্থবিরতা ও ভীরুতা বাসা বাঁধে, তখন সমাজকে জাগিয়ে তুলতে প্রলয় কাল বা ওলোটপালোট করে দেওয়ার মতো প্রচণ্ড আঘাতের প্রয়োজন হয়।
৭. “হৈদরী হাঁক” মারার মাধ্যমে কবি কী অর্জন করতে চান?
উত্তর: বীরত্বের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসকদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করতে এবং বিপ্লবীদের রণহুংকারে ভারতের আকাশ বাতাস জাগিয়ে তুলতে চান।
৮. “কাঁধে নে দন্দুভি ঢাক”— রণবাদ্যের এই আহ্বানের উদ্দেশ্য কী?
উত্তর: দন্দুভি বা ঢাকের আওয়াজ হলো যুদ্ধের সংকেত। কবি চান তরুণরা ঘরে বসে না থেকে মুক্তির যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য রণসাজে সজ্জিত হোক।
৯. “মৃত্যুকে ডাক জীবন পানে!”— এই বিরুদ্ধোক্তির কারণ কী?
উত্তর: দেশের জন্য প্রাণ বিসর্জন দেওয়া আসলে মৃত্যুকে ভয় পাওয়া নয়, বরং দেশের মুক্তি তথা নতুন এক জীবনের পথ প্রশস্ত করা। মৃত্যুকে তুচ্ছ করলেই নতুন জীবনের স্বাদ পাওয়া যায়।
১০. কবি বন্দিশালায় আগুন জ্বালানোর কথা বলেছেন কেন?
উত্তর: পরাধীনতার গ্লানি মুছে ফেলার একমাত্র উপায় হলো বিপ্লবী বিদ্রোহের অগ্নিশিখা। সেই আগুনে বন্দিশালার শিকল ও তালা পুড়িয়ে ধ্বংস করার ডাক দিয়েছেন কবি।
১১. “যত সব বন্দি-শালায়— আগুন জ্বালা”— এখানে আগুন কিসের প্রতীক?
উত্তর: এখানে আগুন হলো প্রবল জাগরণ, ক্রোধ এবং সমস্ত অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীক। যা পরাধীনতার গ্লানিকে ভস্মীভূত করবে।
১২. “হীন তথ্য” বলতে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর: শোষক ইংরেজরা মনে করেছিল মানুষের দেহকে ফাঁসি দিয়ে বুঝি সত্যকে বা স্বাধীনতাকে স্তব্ধ করা যায়। মানুষের অমিন অবিনাশী সত্য যে ভগবানের মতো অপরাজেয়, এই বোধ তাদের ছিল না বলেই তাদের ধারণাকে কবি হীন তথ্য বলেছেন।
১৩. “নাচে ওই কাল-বোশেখি”— কাল-বোশেখির রূপকটি গুরুত্ব কী?
উত্তর: কাল-বোশেখি যেমন মুহূর্তে সমস্ত জীর্ণতা উড়িয়ে দেয়, তেমনি বিপ্লবীদের প্রচণ্ড আক্রমণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দেবে— এই ভাবনাই এখানে ব্যক্ত হয়েছে।
১৪. “লাথি মার, ভাঙরে তালা!”— এই চরণে কবির কোন মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে?
উত্তর: পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিঁড়ে ফেলার তীব্র জেদ, সাহস এবং চরম বিদ্রোহের মনোভাব এখানে মূর্ত হয়েছে। অনুনয় নয়, আঘাতের মাধ্যমেই মুক্তি ফেরাতে চান কবি।
১৫. “মুক্ত স্বাধীন সত্যকে রে”— সত্যকে মুক্ত স্বাধীন বলার কারণ কী?
উত্তর: সত্য কখনও কোনো প্রাচীর বা শিকলে বন্দি হতে পারে না। ভারতের স্বাধীনতার দাবি যে এক পরম সত্য, তাকে ব্রিটিশরা কারাগারে বন্দি করে রাখতে পারবে না— এই বিশ্বাস থেকেই কবি এমন বলেছেন।
| Details | Link |
|---|---|
| নবম শ্রেণী ও পরবর্তী মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি WhatsApp গ্রুপ |
ভাঙার গান কবিতার ৩ নম্বরের প্রশ্ন উত্তর | Class 9 Bhangar Gan 3 Marks Question Answer
১. “শিকল-পূজোর পাাষাণ-বেদী! / ওরে ও তরুণ ঈশান!”— এই চরণে তরুণ প্রজন্মের প্রতি কবির প্রত্যাশা আলোচনা করো।
উত্তর: পরাধীন ভারতবর্ষের কারাগারে ব্রিটিশ শাসকরা বিপ্লবীদের বন্দি করে যে শৃঙ্খলের প্রথা তৈরি করেছে, তাকেই কবি ‘শিকল-পূজোর পাষাণ-বেদী’ বলেছেন। কবির প্রত্যাশা, বর্তমান তরুণ প্রজন্ম ঈশান বা শিবের রুদ্ররূপ ধারণ করে এই অন্যায়ের ভিত্তিকে চূর্ণ করবে। শিব যেমন প্রলয়কালে জগতকে জঞ্জালমুক্ত করেন, তরুণরাও তেমনি ভারতদেশকে গোলামির শিকল থেকে মুক্ত করবে— এই আশাবাদই এখানে কবি ব্যক্ত করেছেন।
২. “কে মালিক? কে সে রাজা? / কে দেয় সাজা?”— এই প্রশ্নগুলোর মাধ্যমে কবির কোন মনোভাব প্রকাশিত হয়েছে?
উত্তর: এই পংক্তিগুলোর মাধ্যমে কবি বিদ্রোহী নজরুল অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসনের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, ভারতবাসী বা বিপ্লবীদের সাজা দেওয়ার অধিকার কোনো দস্যু রাজার নেই। সত্যের সৈনিকেরা চিরকাল মুক্ত। ইংরেজরা নিজেদের এদেশের মালিক বা রাজা বলে জাহির করলেও নজরুলের কাছে তারা তুচ্ছ ও হীন। শাসকের দম্ভকে বিদ্রূপ করে মানুষের আত্মিক শক্তির জয়গান গাওয়াই এখানে কবির লক্ষ্য।
৩. “ভগবান পরবে ফাঁসি? / সর্বনাশী / শিখায় এ হীন তথ্য কে রে?”— এই উক্তিটির গভীর অর্থ বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন পরিচালনা করছিলেন যে বিপ্লবীরা, তাদের চরিত্রে কবি ঈশ্বর বা ভগবানের অস্তিত্ব অনুভব করতেন। ব্রিটিশরা যখন বিপ্লবীদের ফাঁসি দেওয়ার হুকুম দেয়, তখন নজরুলের কাছে মনে হয় যেন তারা খোদ ভগবানকেই ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে মারতে চাইছে। সত্য ও ভগবান অবিনাশী, তাকে কখনও ফাঁসিতে মারা সম্ভব নয়। তাই ইংরেজদের এই উদ্ধত আস্ফালনকে কবি একটি ক্ষুদ্র মগজপ্রসূত ‘হীন তথ্য’ বা নীচ মিথ্যা বলে উপহাস করেছেন।
৪. “হৈদরী হাঁক, / কাঁধে নে দন্দুভি ঢাক”— এই রণধ্বনির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: দেশের স্বাধীনতার জন্য কবির কাছে কোনো দুর্বলতা বা ভীরুতার স্থান নেই। তিনি বিপ্লবীদের হজরত আলির মতো বীরত্বব্যঞ্জক ‘হৈদরী হাঁক’ বা বীরত্বের গর্জন ছাড়তে বলেছেন। ‘দন্দুভি’ হলো এক ধরণের বড় ঢাক বা রণবাদ্য। যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য এই বাদ্য কাঁধে তুলে নেওয়ার অর্থ হলো বিপ্লবীদের সরাসরি লড়াইয়ে আহ্বান করা। পরাধীনতার স্তব্ধতা ভেঙে বিদ্রোহের শব্দে মেতে ওঠার ডাকই হলো এই চরণের মূল সুর।
৫. “লাথি মার ভাঙরে তালা! / যত সব বন্দি-শালায়— / আগুন জ্বালা”— কবির এই চরম বিদ্রোহী আহ্বানের কারণ কী?
উত্তর: নজরুল জানতেন অনুনয়-বিনয় বা অহিংসার পথে ব্রিটিশদের হৃদয় পরিবর্তন অসম্ভব। তাই তিনি চেয়েছিলেন শক্তিপ্রয়োগ ও প্রবল বিদ্রোহ। কারাগার বা বন্দিশালা হলো ব্রিটিশদের শক্তির কেন্দ্র, তাই লাথি মেরে সেই বন্দিদশার তালা ভাঙা এবং পরাধীনতার সমস্ত স্মৃতিচিহ্নে আগুন জ্বালিয়ে তা উপড়ে ফেলাই হলো দেশপ্রেমের শ্রেষ্ঠতম বহিঃপ্রকাশ। এই চরমপন্থার মাধ্যমেই ভারতভূমি স্বাধীন হবে বলে কবি বিশ্বাস করতেন।
| Details | Link |
|---|---|
| নবম শ্রেণী ও পরবর্তী মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি WhatsApp গ্রুপ |
ক্লাস ৯ বাংলা ভাঙার গান কবিতার ৫ নম্বর প্রশ্ন ও উত্তর | Class 9 Bengali Bhangar Gan 5 Marks Important Question Answer
১. ‘ভাঙার গান’ কবিতায় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম কীভাবে তরুণ প্রজন্মকে বিপ্লবের পথে আহ্বান করেছেন তা আলোচনা করো।
উত্তর: বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘ভাঙার গান’ কবিতাটি পরাধীন ভারতবর্ষের এক ঐতিহাসিক দলিল। কবি দেখেছিলেন যে ব্রিটিশ শাসকরা এদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের কারাগারে বন্দি করে বিপ্লব দমন করতে চাইছে। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য তিনি ভারতের যুবশক্তির শক্তির ওপর আস্থা রেখেছেন।
কবি তরুণদের মহাদেবের ধ্বংসাত্মক রূপ বা ‘পাগলা ভোলা’ হিসেবে কল্পনা করেছেন। তিনি তাদের আদেশ দিয়েছেন কারাগারের লৌহ-কপাট ভেঙে লোপাট করতে। ব্রিটিশদের শিকল পুজো বা নির্মম অত্যাচারের ভিত্তিকে লাথি মেরে গুঁড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কবির মতে, বিপ্লবীরা হলো ‘মুক্ত স্বাধীন সত্য’। ইংরেজরা যে তাদের ফাঁসি দিয়ে দমাতে চায়, সেই হীন তথ্যকে উপহাস করে বিপ্লবীদের মনে বল দিয়েছেন নজরুল। তিনি তরুণদের প্রলয়-বিষাণ বাজাতে এবং গাজনের প্রমত্ত নাচের মতো বিদ্রোহে মেতে উঠতে বলেছেন। ‘হৈদরী হাঁক’ বা বীরের গর্জনে বন্দিশালার ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া এবং স্বাধীনতার বেদী রক্ষার জন্য আগুন জ্বালিয়ে দাসত্বের চিহ্ন মুছে ফেলাই হলো কবির মূল মন্ত্র। এভাবেই নজরুল তরুণ প্রজন্মকে ভীরুতা ত্যাগ করে চরম বিপ্লবের পথে জীবন তুচ্ছ করে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্ররোচিত করেছেন।
২. “শিকল-পূজোর পাাষাণ-বেদী!”— উক্তিটির তাৎপর্য ব্যাখা করে কবির বিদ্রোহের স্বরূপটি বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: ‘ভাঙার গান’ কবিতায় ‘শিকল-পূজোর পাষাণ-বেদী’ কথাটির মাধ্যমে কবি পরাধীন ভারতের কারাগার ও শৃঙ্খলের নিষ্ঠুরতাকে চিত্রিত করেছেন। ইংরেজ শাসকরা ভারতবাসীকে শিকল পরিয়ে বন্দি রাখাকেই এক ধরণের উৎসব বা ধর্মে পরিণত করেছিল। সেই শিকল পুজোর ভিত্তি ছিল বিপ্লবীদের তপ্ত রক্ত।
নজরুলের বিদ্রোহ ছিল এই দাসত্বের মানসিকতা ও ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। তিনি কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা চাননি, চেয়েছিলেন মানসিক ও আত্মিক মুক্তি। তাই তিনি ধ্বংসের দেবতা রুদ্র বা শিবের কাছে প্রার্থনা জানিয়েছেন বিনাশের জন্য। কবি মনে করেন, জীর্ণ ও গ্লানিময় পুরোনো শাসন কাঠামোটি ভেঙে না ফেললে স্বাধীনতার নতুন নিশান ওড়ানো সম্ভব নয়। তাঁর বিদ্রোহ কোনো ব্যক্তি শাসনের বিরুদ্ধে নয়, বরং সামগ্রিক শৃঙ্খল ও শোষণের বিরুদ্ধে। তিনি বিপ্লবীদের অবিনাশী ভগবানের সঙ্গে তুলনা করে তাদের আত্মমর্যাদাবোধকে জাগিয়ে তুলেছেন। লাথি মেটে তালা ভাঙা বা আগুন জ্বালিয়ে বন্দিশালা উপড়ে ফেলার ডাক নজরুলের সেই আপসহীন এবং অগ্নিবর্ষী বিদ্রোহের পরিচয় দেয়, যা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে এক নতুন গতিদান করেছিল।
৩. ‘ভাঙার গান’ কবিতায় পৌরাণিক ও বীরত্বব্যঞ্জক অনুষঙ্গগুলি কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে? এর গুরুত্ব আলোচনা করো।
উত্তর: কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘ভাঙার গান’ কবিতায় ভারতীয় পুরাণ এবং বীরত্বের নানা অনুষঙ্গ ব্যবহার করে এক অভূতপূর্ব উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছেন।
শিবের রূপক: কবি তরুণ প্রজন্মকে ‘ঈশান’ বা ‘পাগলা ভোলা’ বলেছেন। পুরাণে শিব ধ্বংসের দেবতা। তিনি যেমন তণ্ডব নাচের মাধ্যমে জগতকে জঞ্জালমুক্ত করেন, যুবসমাজও তেমনি পরাধীনতার জঞ্জাল সরাবে।
গাজন ও দন্দুভি: শিবের উৎসব ‘গাজন’ এবং রণবাদ্য ‘দন্দুভি’-র উল্লেখের মাধ্যমে কবি বিদ্রোহকে এক পবিত্র ও প্রমত্ত উৎসবের মর্যাদা দিয়েছেন।
হৈদরী হাঁক: ইসলামের বীর পুরুষ হজরত আলির বীরত্বব্যঞ্জক হুংকারকে কবি স্বাদেশিক সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করেছেন, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও অসীম সাহসের প্রতীক।
কাল-বোশেখি: ধ্বংসকারী ঝড়ের রূপকে ব্রিটিশ শাসনের পতনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
এই অনুষঙ্গগুলি ব্যবহারের মাধ্যমে কবি সাধারণ বিদ্রোহকে এক মহাজাগতিক ও আধ্যাত্মিক বিপ্লবের রূপ দিয়েছেন। এতে বিপ্লবীদের মনে ভয়ের বদলে এক ঐশ্বরিক শক্তি ও বীরত্বের সঞ্চার হয়েছে, যা পরাধীনাতর শিকল ভাঙতে অপরিহার্য ছিল।
৪. “ভগবান পরবে ফাঁসি? / সর্বনাশী / শিখায় এ হীন তথ্য কে রে?”— কবি নজরুলের এই বিদ্রূপাত্মক উক্তির প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব আলোচনা করো।
উত্তর: ব্রিটিশ শাসকরা যখন একের পর এক ভারতীয় বিপ্লবীদের রাজদ্রোহের অভিযোগে ফাঁসিকাঠে ঝোলাচ্ছিল, সেই প্রেক্ষাপটেই কবির এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। নজরুলের দর্শনে দেশপ্রেম হলো ঈশ্বর উপাসনা এবং দেশের সেবকরা হলো ভগবানের অবতার।
ইংরেজ জেলেরা বা পুলিশরা যখন মনে করে বিপ্লবীদের গর্দান নিলেই স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতি ঘটবে, তখন কবি তাদের মূর্খতাকে চরম বিদ্রূপ করেন। তিনি জানেন আত্মা অবিনশ্বর, সত্য অমর। ভগবান বা সত্যের কি কখনও ফাঁসি দেওয়া যায়? এই ধারণাটাই কবির কাছে অত্যন্ত নীচ বা ‘হীন তথ্য’। এই বিদ্রূপের মাধ্যমে কবি বিপ্লবীদের বীরত্বের চরম শিখরে বসিয়েছেন। ফাঁসিকাঠকে ভয় না পাওয়ার মন্ত্র হিল এই উক্তি। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা যে ঈশ্বরদত্ত ও শাশ্বত এবং একে কোনো জাগতিক ফাঁসিকাঠ স্তব্ধ করতে পারে না— এই অমোঘ সত্যটি প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে কবি ভারতের স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষের মনোবল বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন।
৫. ‘ভাঙার গান’ কবিতায় কবির ধ্বংসাত্মক মানসিকতা আসলে এক উন্নত সৃষ্টির ইঙ্গিত— আলোচনা করো।
উত্তর: আপাতদৃষ্টিতে ‘ভাঙার গান’ কবিতাটিতে আগুন জ্বালানো, তালা ভাঙা বা লোহার কপাট লোপাট করার মতো ধ্বংসাত্মক কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কবি নজরুলের এই ধ্বংস দণ্ড কেবল বিনাশের জন্য নয়, বরং তা নবসৃষ্টির আবাহন।
নজরুল জানতেন, শৃঙ্খল ও জঞ্জালের ওপর কখনও মুক্তির সৌধ নির্মিত হয় না। পরাধীনতার যে প্রাচীর ভারতের সমৃদ্ধিকে আটকে রেখেছে, তাকে ভাঙা জরুরি। তাই মহাপ্রলয়ের দেবতাকে ডেকেছেন তিনি। প্রলয়ের পর যেমন নতুন পৃথিবী জন্ম নেয়, তেমনি নজরুলের ‘ভাঙার গান’ গাইতে গাইতে যখন পরাধীনতার দুর্গ ধূলিসাৎ হবে, তখনই নতুন স্বাধীন ভারতবর্ষের জন্ম হবে। কাল-বোশেখি যেমন ধুলো-ময়লা উড়িয়ে দিয়ে ঝকঝকে আকাশ রেখে যায়, কবির বিদ্রোহও তেমনই পরাধীনতার কলঙ্ক মুছে দেবে। লাথি মেরে তালা ভাঙা আসলে স্বাধীনতার প্রবেশপথ তৈরি করা। সুতরাং নজরুলের এই ‘ভাঙা’ আসলে নতুনের ‘গড়া’-র প্রথম পদক্ষেপ।
৬. ‘ভাঙার গান’ কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
উত্তর: কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘ভাঙার গান’ কবিতাটির নামকরণ এক গভীর তাৎপর্য বহন করে। কবিতার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কবি কেবল ভাঙার বা ধ্বংসের কথা বলেছেন। কিন্তু এই ধ্বংসের লক্ষ্য হলো ভারতের স্বাধীনতা।
কবিতায় পরাধীনতার প্রতীক হিসেবে এসেছে কারাগারের ‘লৌহ-কপাট’, ‘শিকল’ ও ‘তালা’। কবি বিপ্লবীদের আহ্বান জানিয়েছেন এই সব আগল ভেঙে ফেলতে। রুদ্র রূপ ধারণ করে এই জীর্ণ পরাধীন শৃঙ্খল ভেঙে নতুন দিনের আবাহনই এই কবিতার মূল উপজীব্য। নজরুলের কাছে এই ‘ভাঙা’ হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা এবং আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা। যখন কোনো প্রথা বা শাসন শোষণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তার বিনাশই হলো মঙ্গল। কবির রণংদেহী সুর এবং প্রলয়োল্লাসী ভাষা পরাধীনতার কারাগার ভাঙার জয়ধ্বনি দেয়। তাই কবিতার ভাববস্তু ও অন্তর্নিহিত বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে ‘ভাঙার গান’ নামটি শিল্পের বিচারে এবং বিষয়ের বিচারে সম্পূর্ণ যথাযথ ও সার্থক হয়েছে।
৭. “মৃত্যুকে ডাক জীবন পানে!”— এই উক্তির আলোকে বিপ্লবীদের জীবনদর্শন আলোচনা করো।
উত্তর: ‘ভাঙার গান’ কবিতায় কবি নজরুলের এই অদ্ভুত নির্দেশটি বিপ্লবীদের জীবনদর্শনের এক গভীর সত্য প্রকাশ করে। সাধারণ মানুষের কাছে মৃত্যু মানে শেষ বা অন্ধকার। কিন্তু দেশের জন্য উৎসর্গীকৃত বিপ্লবীদের কাছে মৃত্যুই হলো বড় জীবনের পথ।
দেশের পরাধীনতা ও গ্লানির মধ্যে বেঁচে থাকা আসলে মৃতবৎ জীবন। কবি চান বিপ্লবীরা মৃত্যুকে ভয় না পেয়ে তাকে বরণ করুক। কারণ ফাঁসিকাঠের মাধ্যমে বিপ্লবীর যে মৃত্যু ঘটে, তা আসলে লক্ষ তরুণকে আন্দোলনের পথে উদ্বুদ্ধ করে। অর্থাৎ ব্যক্তিগত জীবনের প্রাণের অবসান আসলে দেশমাতৃকার নতুন জীবনের সূচনা ঘটায়। মৃত্যু এখানে ভয়াবহ নয়, বরং প্রলয় দোলার মতো আনন্দময়। জীবনের পূর্ণতা যে নিজের আরাম-আয়েশে নয়, বরং দেশের তরে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যে— এই উচ্চতর নীতিই বিপ্লবীদের শিখিয়েছিলেন কবি। মৃত্যুকে যখন জীবনের সাথে মিলিয়ে দেওয়া হয়, তখন তা অমরত্বের পথ প্রশস্ত করে দেয়।
| Details | Link |
|---|---|
| নবম শ্রেণী ও পরবর্তী মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি WhatsApp গ্রুপ |
আজকের পোস্ট এর মধ্যে ভাঙার গান কবিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা, কবিতাটির বিষয়বস্তু এবং উত্তর সহ প্রশ্নও আলোচনা করা হল, যেগুলি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বিশেষ ভাবে তোমাদের সহায়ক হয়ে উঠবে।
| Details | Link |
|---|---|
| নবম শ্রেণী অন্যান্য সমস্ত বিষয়ের নোট (Class IX All Notes) |
নবম শ্রেণী ভাঙার গান | কাজী নজরুল ইসলাম ভাঙার গান প্রশ্ন উত্তর | ভাঙার গান সারাংশ | Class 9 Bengali Bhangar Gan Notes | ভাঙার গান কবিতার গুরুত্বপূর্ণ MCQ ও বড় প্রশ্ন।
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম Study গ্রুপে যুক্ত হোন -


